‘তারাবীহর রাকাআত সংখ্যা একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ পুস্তিকার পর্যালোচনা

5 months ago admin 0

অবতরণিকা
মতবৈচিত্র মানুষের একটি স্বভাবজাত চরিত্র। পৃথিবীতে সর্বদিক বিবেচনায় মতৈক্যপূর্ণ বিষয়ের উপস্থিতি নিতান্তই বিরল। সহজাতিক এ বিষয়টি জাগতিক অঙ্গন ছাপিয়ে ধর্মীয় অঙ্গনেও সমানভাবে বিদ্যমান। মহান আল্লাহ তা‘আলা জ্ঞানবৈচিত্র, মতবৈচিত্র এবং বিবেক ও রুচিবৈচিত্র দিয়েই মানব জাতিকে সৃজন করেছেন। সৃষ্টিগত এ প্রাকৃতিক প্রবাহকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে ধর্মীয় অঙ্গনে মতবিচিত্রা ও মতস্বাতন্ত্র্য গ্রহণ বর্জনের স্বীকৃত কিছু নীতিমালা রয়েছে। মূলগত বিষয়ে মতবৈচিত্র ও মতভিন্নতার ক্ষেত্রে শিথিলতা ও উদারনীতি গ্রহণের কোনো অবকাশ নেই। এক্ষেত্রে বিশুদ্ধ কুরআন-হাদীস আশ্রিত মতটিই প্রবলভাবে প্রাধান্য লাভ করবে। বিপরীত মতটিকে সাহসিকতার সাথেই ছুড়ে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে নমনীয়তার কোনোই ফাঁক-ফোকড় নেই। পক্ষান্তরে শাখাগত বিষয়ে উদারনৈতিক মনোভাব ব্যক্ত করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। বরং এক্ষেত্রে কাঠিন্য পরিহারপূর্বক শিথিলতা গ্রহণই ইসলামী শরীয়তের রুচিসঙ্গত নির্দেশনা। আজ শাখাগত মতবৈচিত্রগুলো মুসলিম অমুসলিম প্রভেদের পর্যায়ে গিয়ে উন্নীত (!) হয়েছে। আমাদের সমাজের কিছু অতি উৎসাহী ভ্রাতা মহোদয় এ ক্ষেত্রটিতে এসে চরম প্রান্তিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। অথচ বিষয়গুলো নিতান্তই শাখাগত এবং উত্তম অনুত্তম পর্যায়ের প্রভেদ; ঢাল-তলোয়ার জাতীয় কোন প্রভেদ নয়। কিন্তু তাঁদের বাক অসিতে রক্তাক্ত হচ্ছে চারিধার। সত্যের পথে আহ্বান, সত্যের প্রচারণা এবং মিথ্যার অপনোদন প্রক্রিয়াতেও রয়েছে চমৎকার নববী আদর্শ। সত্যের প্রচারণায় আগ্রহদীপ্ত ভ্রাতাম-লীর ক্ষেত্রে সে আদর্শ চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। শরীয়াগত দায়িত্ব পালন ও পুণ্যার্জনের পথে তাঁরা শরীয়তের স্বতঃসিদ্ধ নীতিমালাকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে চলছেন। তারাবীহ নামাযের রাকাআত সংখ্যার প্রভেদ শাখাগত শ্রেণীরই একটি প্রভেদ। এতে প্রান্তিকতার আশ্রয় গ্রহণ করার মত কোনো উপাদান নেই। মুহাতারাম মুযাফফর বিন মুহসিন সালাফী অঙ্গনে তুমুল আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। তিনি ‘তারাবীহর রাকাআত সংখ্যা একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। পুস্তিকাটির পত্র-পল্লব জুড়ে লেখক মহোদয় আপত্তিকর বক্তব্যের পসরা সাজিয়েছেন। আর তাতে যে তিনি কি পরিমাণ তথ্যবিভ্রাটের মহড়া প্রদর্শন করেছেন তার তালিকা তো বেশ দীর্ঘ। আমরা বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে পর্যায়ক্রমে মুহতারাম লেখকের আপত্তিকর বক্তব্যগুলোর উপর পর্যালোচনামূলক আলোচনা তুলে ধরতে চেষ্টা করবো; ইনশাআল্লাহ!

লেখকের বক্তব্য ১
মুহতারাম লেখক তাঁর পুস্তিকাটিকে পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। প্রথম অধ্যায়টিকে দু’টি শিরোনামে বিভক্ত করেছেন। প্রথম শিরোনামটি হলো ‘৮ রাকাআত তারাবীহ্র অকাট্য প্রমাণ’। লেখক তাঁর পুস্তিকার ৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ৮ রাকা‘আত তারাবীহ্র অকাট্য প্রমাণ অধ্যায়ে সহীহ বুখারীর আট রাকাআতের তাহাজ্জুদ বিষয়ক প্রসিদ্ধ বর্ণনাটি উল্লেখ করেন। হাদীসটির আরবী পাঠ নি¤œরূপ-
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كَيْفَ كَانَتْ صَلَاةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَمَضَانَ قَالَتْ مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلَا فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُصَلِّي أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ فَلَا تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلَا تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّي ثَلَاثًا فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ تَنَامُ قَبْلَ أَنْ تُوتِرَ قَالَ تَنَامُ عَيْنِي وَلَا يَنَامُ قَلْبِي

অর্থ : আবূ সালামা ইবনে আব্দুর রহমান রাযি. একদা আয়িশা রাযি. কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমাযানের রাতের নামায কিরূপ ছিল? উত্তরে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান মাসে এবং রমাযানের বাইরে ১১ রাকাআতের বেশি নামায আদায় করতেন না। তিনি প্রথমে চার রাকাআত পড়তেন। তুমি তার সৌন্দর্য এবং দীর্ঘতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না। এরপর চার রাকাআত পড়তেন। তুমি তার সৌন্দর্য এবং দীর্ঘতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি তিন রাকাআত পড়তেন। সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৫৬৯

পর্যালোচনা
হাদীসটিতে বলা হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান মাসে এবং অন্যান্য মাসে চার রাকাআত করে আট রাকাআত এবং তিন রাকাআত বিতর-সর্বমোট এগারো রাকাআতের চেয়ে বেশি পড়তেন না। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক আমল ছিল না। কারণ খোদ আম্মাজান আয়িশা রাযি. এর সূত্রেই তাহাজ্জুদের নামায ফজরের সুন্নাত ব্যতিরেকে তের রাকাআত হওয়াও প্রমাণিত আছে। দেখা যেতে পারে সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৬৪; ফাতহুল বারী ৩/২৬; কিতাবুত তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১০।
অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাত্রের নামায ইশার দুই রাকাআত সুন্নাত ও বিতর ছাড়া কখনো কখনো সর্বমোট চৌদ্দ রাকাআত বা ষোল রাকাআতও হতো; বরং কোনো বর্ণনা মতে আঠারো রাকাআতও প্রমাণিত হয়। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/২১, হাদীস নাম্বার ৮৯৭; আত-তারাবীহু আকসারা মিন আলফি আম ফিল মাসজিদিন নাবাবী, আতিয়্যা মুহাম্মদ সালেম, সৌদি আরব ২১

উপরন্তু যদি হাদীসটি তারাবীহ প্রসঙ্গে হতো তাহলে স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন মসজিদে নববীর বিশ রাকাআত তারাবীহ এর উপর আপত্তি করতেন। ১৪ হিজরী থেকে নিয়ে উম্মুল মুমিনীনের মৃত্যু সন ৫৭হি. পর্যন্ত অবিরাম চল্লিশ বছর তাঁর কক্ষ সংলগ্ন মসজিদে নববীতে বিশ রাকাআত তারাবীহ হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন কি কখনো এর উপর আপত্তি করেছেন? তার কাছে তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে একটি অকাট্য হাদীস থাকবে আর তাঁর সামনে চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই হাদীসের বিরোধিতা হবে, তারপরও তিনি নীরব নিশ্চুপ থাকবেন? এটা কি কখনো সম্ভব?

আট রাকাআতের পক্ষে লেখক মহোদয়দের সবচেয়ে শক্তিশালী (?) যুক্তিঅস্ত্র হলো, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই নামায। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, তারা আট রাকাআতের সপক্ষে শক্তিশালী কোনো দলীল না পেয়েই এই যু্িক্তর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। নতুবা এটা ধোপে টেকার মত কোনো যুক্তি নয়। কারণ এই যে, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদকে একাকার করে দেখানো হচ্ছে এর সপক্ষে কি কোনো হাদীস আছে? সাহাবী উক্তি? কিংবা তাবিয়ী উক্তি? অন্য কোনো মাসে শেষ নিশিথে দাঁড়িয়ে কেউ কি কোনো কালে বলেছে আমি তারাবীহ পড়ছি। রমাযান মাসে ইশার নামাযের পরে তারাবীহতে দাঁড়িয়ে কেউ কি বলছে আমি তাহাজ্জুদ পড়ছি। দু’টি নামায এক হলে একথা কেউ বলেননি কেন? বাধা কোথায়? প্রশ্ন হতে পারে একটি বিষয়ের দু’টি নাম হতে পারে। উত্তরে আমরাও বলি একটি বিষয়ের দু’টি নাম হতে পারে; বরং দু’টি কেন একাধিক নামও হতে পারে। তবে তার জন্য শর্ত হলো যে কোনো নামে যখন তখন সম্বোধন করা বিধিত থাকতে হবে। এক সময় এক নাম অন্য সময় ভিন্ন নাম এমনটি হলে এটা সে বিষয়ের একাধিক নাম হলো না। তাহাজ্জুদের জায়গায় তারাবীহ, তারাবীহের জায়গায় তাহাজ্জুদ বলার বৈধতা এবং অনুমোদন থাকলেই কেবল বলা যাবে দুটো একই বিষয়। এবার আমরা তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ শব্দ দু’টির আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ্য করি। অভিধান এবং পরিভাষা এ দুটো নামাযকে একই নামায হিসেবে অভিহিত করে কি না?

নিচে বিখ্যাত কিছু আরবী অভিধান গ্রন্থের বক্তব্য তুলে ধরা হলো,

তাহাজ্জুদ :

১. তাহাজ্জুদ অর্থ রাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করা। তাহাজ্জুদ শব্দটি স্ববিরোধী অর্থবহ একটি শব্দ। (অর্থাৎ শব্দটি একই সাথে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার অর্থ প্রদান করে।) আলমুনাবী, আত্তাউকীফ আলা মুহিম্মাতিত তাআরিফ ১/২১১
২. তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। ইসমাইল বিন হাম্মাদ আলজাউহারী, আসসিহাহ ফিললুগাহ ২/২৪৩
৩. তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে ঘুমানোর পর জাগ্রত হওয়া। ড. জাউয়াদ আলী, আলমুফাসসাল ফি তারিখিল আরব ১২/৪২৪
৪. وتَهَجَّدَ القوم استيقظوا للصلاة তাহাজ্জাদাল কাউমু অর্থ মানুষ নামাযের জন্য জাগ্রত হয়েছে।Ñ ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব ৩/৪৩১
৫. তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে নিদ্রা যাওয়া, নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়া। সালাতুত তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নফল নামায আদায় করা।
صلاة التهجد: التنفل بعد النوم… Spend the night in prayer
মুহাম্মদ কালআজী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১৮১

তারাবীহ :

১. তারাবীহ অর্থ : রমাযান মাসে দশ সালামে বিশ রাকাআত নামায আদায় করা। তারাবীহকে তারাবীহ বলে নামকরণের কারণ হলো, মানুষ তারাবীহ নামাযের ভিতরে প্রত্যেক চার রাকাআত অন্তর বসে এবং বিশ্রাম গ্রহণ করে। (তারাবীহ এটা আরবী তারবীহাহ এর বহুবচন। তারবীহাহ অর্থ বিশ্রাম গ্রহণ করা।) মুহাম্মদ বিন আবুল ফাতহ আলহাম্বলী, আলমাতলা’ আলা আবওয়াবিল ফিকহ ১/৯৫
২. ‘আমি তাদের নিয়ে তারাবীহ নামায আদায় করেছি’ এখানে তারাবীহ শব্দটি তারবীহাহ এর বহুবচন। আবূ সাঈদ রাযি. থেকে বর্ণিত, প্রত্যেক চার রাকাআত অন্তর মুসল্লীরা বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে বলে তারবীহাহকে তারবীহাহ বলা হয়। আল্লামা মুতাররিযী, আলমুগরিব ২/৪০৯
৩. তারাবীহকে তারাবীহ নামে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাআত অন্তর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে। মুরতাযা আযযাবিদী, তাজুল আরুস ১/১৬০৪
৪. তারাবীহ এর একবচন হলো, তারবিহাহ। অর্থ, বিশ্রাম গ্রহণ করা Recreation । তারাবীহকে তারাবীহ নামে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাআত অন্তর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে। The long prayers in nights of Ramadan মুহাম্মদ কালআজী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১২৭
৫. সালাতুত তারাবীহ অর্থ, রমাযান মাসে রাতে ইশার নামাযের পর বিশ রাকাআত নামায আদায় করা। A prayer performed during the nights of Ramadan
মুহাম্মদ কালআজী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১৭৫

উপরোক্ত অভিধানগুলোতে তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ এর স্পষ্ট সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে কোথাও তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহকে একাকার করে দেখানো হয়নি। উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, তাহাজ্জুদের ধাতুগত অর্থই হলো, ঘুমানো বা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। এতে প্রতীয়মান হয়, তাহাজ্জুদের ব্যাপারটি ঘুমোত্তর সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট।
তাহাজ্জুদের বিষয়টি সরাসরি পবিত্র কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামায আদয় করবে। এটা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।’ সূরা বানী ইসরাইল ৭৮

এবার লক্ষ্য করা যাক, মহান মুফাসসিরীনে কেরাম তথা কুরআন বিশেষজ্ঞগণ উপরোল্লিখত আয়াতস্থিত তাহাজ্জুদের কি ব্যাখ্যা করেছেন।

১. তাহাজ্জুদের ব্যাপারে তিনটি উক্তি রয়েছে। ১. নিদ্রা যাওয়া এরপর নামায আদয় করা এরপর আবার নিদ্রা যাওয়া এরপর আবার নামজ পড়া। ২. ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা ৩. ইশার নামাযের পর নামায আদায় করা। এগুলো হলো তাবিয়ীনে কেরামের বিভিন্ন উক্তি। সম্ভবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু ঘুমাতেন এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায পড়তেন এরপর আবার ঘুমাতেন এরপর আবার নামায আদায় করতেন তাই তাবিয়ীনে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযের এ পদ্ধতির অনুসরণে ঘুমোত্তর নামাযকে তাহাজ্জুদ বলে অভিহিত করেছেন। যদি ব্যাপারটি একারণেই হয়ে থাকে তাহলে এটিই ঘনিষ্ঠ এবং যথোপযুক্ত অভিমত। ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ৫/২৮৬

২. হাজ্জাজ বিন আমর আনসারী রাযি. বলেন, তোমাদের অনেকে ধারনা করে, শেষ রাত অবধি নামায পড়া হলেই তা তাহাজ্জুদ নামায হয়ে গেল। না ব্যাপারটি এমন নয়। বরং তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে তারপর নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাহাজ্জুদ নামায এমনি ছিল। আসওয়াদ এবং আলকামা রাযি. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করার নাম।Ñ মু’জামে কাবীর তাবারানী, হাদীস ৩২১৬, মাজামাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ৩৬১৬, হাইসামী রাযি. এর সনদ সহীহ এবং এ সনদের বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী।, আবূ বাকার জাসসাস, আহকামুল কুরআন ৫/৩২

৩. তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। এখন এটা একটি নামাযের নাম হয়ে গেছে। কারণ এ নামাযের জন্য জাগ্রত হতে হয়। সুতরাং তাহাজ্জুদ নামাযের পারিভাষিক অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। আসওয়াদ, আলকামাহ এবং আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ রহ. তাহাজ্জুদের এ অর্থই করেছেন। এরপর কুরতুবী রহ. হাজ্জাজ বিন আমরের হাদীসটি উল্লেখ করেন। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, রাতের একটা সময় নামাযের জন্য জাগ্রত হও। ইমাম কুরতুবী, আলজামি’ লিআকামিল কুরআন ১০/৩০৮

৪. ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির এবং মুহাম্মদ বিন নাসর আলকামা এবং আসওয়াদ রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা।- ইমাম সুয়ূতী রহ., আদদুররুল মানসূর ৯/৭৬

৫. আয়াতটির অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হও এবং নামায আদায় করো। মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া ব্যতীত তাহাজ্জুদের নামায হয় না। জনৈক আনসার সাহাবী সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক সফরে ছিলেন। তখন সে বলল, আজ আমি দেখবো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালেন। এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। এরপর মস্তক মোবারক আকাশ পানে উত্তোলন করলেন, এরপর সূরা আলে ইমরানের চারটি আয়াত পাঠ করলেন। এরপর হাত দ্বারা কোনো ইবাদত করার ইচ্ছা করলেন এবং একটি মিসওয়াক হাতে নিলেন। এরপর তার দ্বারা দাঁত মাজলেন। এরপর উযু করলেন এরপর নামায পড়লেন। এরপর ঘুমালেন। এরপর আবার জাগ্রত হলেন এবং পূর্বোক্ত কাজগুলো আবার করলেন। উলামায়ে কেরাম মনে করেন এই নামাযই সেই তাহাজ্জুদের নামায যে নামায সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন।-সুনানে নাসয়ী কুবরা, হাদীস ১০১৩৯, আবূ ইসহাক নিশাপুরী, আলকাশফু ওয়াল বায়ান ৬/১২৩

৬. তাহাজ্জুদ ঐ নামাযকে বলা হয় যা ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করা হয়। আলকামা, আসওয়াদ, ইবরাহীম নাখায়ী প্রমুখ তাহাজ্জুদের এ অর্থ করেছেন। আরবী ভাষায় তাহাজ্জুদের এ অর্থটিই প্রসিদ্ধ। তেমনিভাবে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন। ইবনে আব্বাস, আয়িশা রাযি.সহ অন্যান্য সাহাবী থেকে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। যেমনটি যথাস্থানে সুবিস্তর আলোচিত হয়েছে। যাবতীয় প্রশংসা এবং অনুগ্রহ আল্লাহ তা’আলার জন্য। তবে হাসান বসরী রাযি. বলেন, তাহাজ্জুদ ঐ নামায যা ইশার নামাযের পর আদায় করা হয়। তার একথার মর্মার্থ হবে, ইশার নামাযের পর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যে নামায আদায় করা হয় তাই তাহাজ্জুদের নামায। তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/১৫০

তাহাজ্জুদের সময় সীমা সম্বন্ধে কয়েকটি হাদীসের বর্ণনা

১. আসওয়াদ রাযি. বলেন, আমি আয়িশা রাযি. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাতের বেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায কেমন ছিল। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম রাত্রে ঘুমাতেন এবং শেষ রাত্রে নামায আদায় করতেন। এরপর বিছানায় ফিরে আসতেন। যখন মুয়াজ্জিন আযান দিতো তখন দ্রুত উঠে যেতেন। যদি প্রয়োজন হতো তবে গোসল করে নিতেন। নতুবা উযু করে মসজিদে চলে যেতেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৪৬
২. ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো গভীর রজনীর নামায। মু’জামে তাবারানী কাবীর, হাদীস ১৬৯৫
৩. মাসরুক রাযি. বলেন, আমি আয়িশা রাযি. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে কখন নামায আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, যখন গভীর রজনীতে মোরগের ডাক শুনতেন তখন নামায আদায় করতেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৩২
৪. রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলাম সাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো এক সফরে ছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ সফরটি কষ্ট এবং দুর্দশার সফর। তোমাদের কেউ যখন বিতর নামায পড়বে তখন যেন সাথে আরো দুই রাকাআত পড়ে নেয়। যদি জাগ্রত হয় তবে তো ভাল কথা। নতুবা সে দুই রাকাআতই তার জন্য তাহাজ্জুদ হিসেবে গণ্য হবে।- সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১১০৬
হাদীসটির ব্যাখ্যায় আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. বলেন, এ দু রাকাআত নামায হলো, ঘুমপূর্ব তাহাজ্জুদ। এটা তাহাজ্জুদ সংক্রান্ত উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের বিপরীত কোনো বক্তব্য নয়। কারণ এটা প্রকৃত অর্থে তাহাজ্জুদ নয়; রূপক অর্থে তাহাজ্জুদ।-আনওয়ার শাহ আলকাশমিরী, ফাইযুল বারী শরহু সহীহিল বুখারী ৪/১

তারাবীহ নামাযের সময় সীমা

১. তারাবীহ নামাযের সময় হলো ইশার নামাযের পর থেকে নিয়ে শেষ রাত পর্যন্ত। কারণ তারাবীহ নামায ইশার নামাযের অনুগামী। বিতর নামায অনুগামী নয়। সুতরাং যদি অপবিত্রাবস্থায় ইশার নামায আদায় করা হয় আর তারাবীহ নামায পবিত্রাবস্থায় আদায় করা হয় তাহলে ইশার নামাযের সাথে সাথে তারাবীহ নামাযকেও দ্বিতীয়বার পড়তে হবে। বিতর দ্বিতীয়বার পড়তে হবে না।Ñআব্দুর রাহমান শাইখযাদাহ, মাজমাউল আনহুর ফি শারহি মুলতাকাল আবহুর ১/২০২
২. তারাবীহ নামাযের সময় হলো, ইশার নামাযের পর থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। বিতর নামাযের পূর্বেও হতে পারে পরেও হতে পারে। কারণ তারাবীহ নামায হলো, নফল নামায যা ইশার নামাযের পর সুন্নাত হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে। এবং এটাই সর্বাধিক সঠিক অভিমত।-খাসরু বিন কারামুয রুমী (৮৮৫ হি. ১৪৮০ খৃ.), দুরারুল হুক্কাম শারহু গুরারিল আহকাম ১/২৩৩
৩. তারাবীহ নামাযের সময় হলো ইশার নামাযের পর থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বিতরের পূর্বে এবং পরে।-মুহাম্মদ বিন আবূ বাকার রাযী, তুহফাতুল মুলূক ১/৮১
৪. ইশার নামায সম্পন্ন করার পরই তারাবীহ নামাযের সময় আরম্ভ হয়।-আব্দুল কারীম রাফিয়ী, ফাতহুল আযীয ফি শারহিল ওয়াজীয ৭/১৫৯
৫. অধিকাংশ মাশায়েখে কেরামের অভিমত অনুসারে তারাবীহ নামাযের সময় হলো, ইশা এবং সুবহে সাদিকের মধ্যবর্তী সময়। কেউ ইশার নামাযের পূর্বে তারাবীহ পড়ে তাহলে তারাবীহ নামায হবে না। তবে যদি বিতর নামাযের পরে পড়ে তাহলে আদায় হবে। কারণ তারাবীহ নামায হলো নফল নামায যা ইশার নামাযের পর সুন্নাত হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে। সুতরাং তারাবীহ নামাযটি অন্যান্য মাসের ইশার নামায পরবর্তী সুন্নাত নামাযের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।-বুরহানুদ্দীন মাহমুদ বিন আহমদ, আলমুহীতুল বুরহানী ২/১৮৪
৬. বিশুদ্ধ মত হলো, তারাবীহ নামাযের সময় হলো ইশার নামাযের পর থেকে নিয়ে শেষ রাত পর্যন্ত বিতর নামাযের পূর্বে এবং পরে। কারণ তারাবীহ নামায হলো নফল নামায যা ইশার নামাযের পর সুন্নাত হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে। হিদায়া কিতাবে এমনটিই রয়েছে।-আবূ বাকার ইবনে আলী যাবিদী, আলজাউহারাতুন নাইয়িরাহ ১/৩৯০
৭. রমাযান মাসে তারাবীহ এবং বিতর নামাযের সময় : রমাযান মাসে ইশার নামাযের পর বিতরের সাথে তারাবীহ নামাযটি আদায় করা হয়। অর্থাৎ ইমাম সাহেব মুসল্লীদের নিয়ে নামায আদায় করেন এবং বিতর নামায পড়েন। এ কারণে তারাবীহতে বিতর পড়া হয়।-মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ শানকিতী, শারহু যাদিল মুস্তানকি’ ৩/৪৭
সারকথা, তাহাজ্জুদ এটি ইসলামের প্রথম যুগের বিধান। রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার অনেক আগে ইসলামের প্রথম যুগে মক্কায় তাহাজ্জুদ বিষয়ে সূরা মুয্যাম্মিল অবতীর্ণ হয়। আর রমাযানের রোযা ফরয হয় হিজরতের পর মদীনায় দ্বিতীয় হিজরীতে। আর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতা‘আলা রমাযানের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেছেন এবং আমি এই মাসে রাত জেগে নামায পড়াকে সুন্নাত করেছি। (সুনানে নাসায়ী; হা.নং ২২০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ; হা.নং ১৩২৮)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত হাদীসে রমাযানের রাতে যে নামাযকে সুন্নাত করেছে তা দ্বারা যদি তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য হয় তাহলে তো হাদীসটি অনর্থক সাব্যস্ত হয়ে যায়। কারণ তাহাজ্জুদ নামাযের বিধান তো আগে থেকেই পুরো বছরের জন্য প্রবর্তিত হয়ে আছে। তো এখন নতুন করে তাহাজ্জুদকে সুন্নাত হিসেবে প্রবর্তন করার কী মানে হতে পারে? তাছাড়া রোযার বিধান প্রবর্তিত হওয়ার আগে তো বহু রমাযান অতীত হয়েছে সেসব রমাযানে কি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম তাহাজ্জুদ আদায় করেননি? আদায় করে থাকলে এখন নতুন করে তাহাজ্জুদের বিধান প্রণয়নের কি স্বার্থকতা থাকতে পারে। তাছাড়া তাহাজ্জুদের বিধানটি সরাসরি কুরআনে পাকে অবতীর্ণ করেছেন। তাহলে এ ব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত বাণীটি কি করে প্রযোজ্য হতে পারে? যদি বলা হয় রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত তাহাজ্জুদের বিধানটিরই সীমাহীন গুরুত্ব বুঝানোর জন্য উক্ত উক্তি করেছেন। তাহলে বলব, আল্লাহ প্রদত্ত তাহাজ্জুদের বিধানটি তো সারা বছরের জন্য ব্যাপৃত ছিল। এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে তো রমাযানের মাঝে সীমিত করে দেয়া হয়েছে। দু’টি বিষয়ের সীমানা পরিধি তো এক হওয়া চাই। তা না হলে গুরুত্ব বর্ণনার কোনো সুযোগ থাকে না। বরং তা আলাদা দু’টি বিষয়ে পরিণত হয়ে যায়। বরং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীটি এমন নামাযের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যার বিধান কুরআন মাজীদের মাধ্যমে নয়, হাদীসের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়েছে। আর তা হলো তারাবীহ নামায।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো, গাইরে মুকাল্লিদ ভাইয়েরা আট রাকাআত তারাবীহ এর পক্ষে ইমাম বুখারী রহ. এর তাহাজ্জুদ বিষয়ক নির্দিষ্ট হাদীসটি দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন এবং ইমাম বুখারী রহ. এর অনুসরণের খুব আগ্রহ ও উদ্দীপনা প্রকাশ থাকেন। কিন্তু ইমাম বুখারী রহ. কি আট রাকাআত তারাবীহ এর পক্ষে ছিলেন? বা তারাবীহ নামায আদায়ের ব্যাপারে তাঁর কর্মপন্থা কি ছিল? ইতিহাস বলে, ইমাম বুখারী রহ. তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদকে এক নামায মনে করতেন না; বরং দু’টি নামাযকে ভিন্ন ভিন্ন নামায মনে করতেন। তিনি রাতের প্রথম ভাগে তারাবীহ পড়তেন এবং শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ পড়তেন। আর তারাবীহের প্রতি রাকাআতে বিশ আয়াত করে পাঠ করতেন এবং এভাবেই কুরআন খতম করতেন। ঘটনাটি ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীর ভূমিকা গ্রন্থ হাদয়ুস সারীতে, ইউসুফ আলমিযযী তাহযীবুল কামাল গ্রন্থে এবং খতীবে বাগদাদী তাঁর রিজাল গ্রন্থ তারিখে বাগদাদে আরো অন্যান্য রিজালবিদ ইমামগণ নির্ভরযোগ্য সূত্রে এনেছেন। বিষয়টি আরবী পাঠ নিম্নরূরূপ-
قال الحاكم أبو عبد الله الحافظ أخبرني محمد بن خالد حدثنا مقسم بن سعد قال كان محمد بن إسماعيل البخاري إذا كان أول ليلة من شهر رمضان يجتمع إليه أصحابه فيصلى بهم ويقرأ في كل ركعة عشرين آية وكذلك إلى أن يختم القرآن وكان يقرأ في السحر ما بين النصف إلى الثلث من القرآن فيختم عند السحر في كل ثلاث ليال- هدى السارى مقدمة فتح البارى ৫৬৩

অর্থ : মাকসাম বিন সা’দ রহ. বলেন, রমাযান মাসে রাতের প্রথম ভাগে মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারীর নিকট তাঁর শিষ্যবৃন্দ জড়ো হয়ে যেত। তখন তিনি তাদের নিয়ে নামায পড়তেন। এবং প্রত্যেক রাকাআতে বিশ আয়াত করে পাঠ করতেন। এবং এভাবে তিনি কুরআন খতম করতেন। আর সাহরীর সময় নামাযে কুরআনের অর্ধাংশ থেকে নিয়ে এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পাঠ করতেন। এভাবে তিন রাতে সাহরীর সময় কুরআন খতম করতেন।-হাদয়ুস সারী ৫৬৩, ইউসুফ আলমিযযী, তারীখে বাগদাদ ২/১২, তাহযীবুল কামাল ২৪/৪৪৬, ইবনে আসাকী, তারিখু মাদীনাতি দিমাশক ৫২/৭৯, আবুল ফারজ ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াহ ৩/১৯, ইয়া’লা হাম্বালী, তাবাকাতুল হানাবিলাহ ১/১৯৬

এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় ইমাম বুখারী রহ. অন্যান্য উলামায়ে সালাফের মত তারাবীহকে তাহাজ্জুদ থেকে ভিন্ন নামায মনে করতেন। সাথে সাথে এটাও প্রমাণ হয়, ইমাম বুখারী রহ. তারাবীহ আট রাকাআত নয় বেশি পড়তেন। কারণ তারাবীহ আট রাকাআত পড়লে রমাযান মাস ত্রিশ দিনের হলেও প্রতি রাকাআতে বিশ আয়াত করে পড়ে কুরআন খতম করা সম্ভব নয়।-মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা., তারাবীহ বিষয়ক দু’টি প্রশ্ন ও তার উত্তর, মাসিক আলকাউসার সেপ্টেম্বর ’০৮, ১৮

তাহাজ্জুদ ইসলামের শুরু যুগে সবার উপর ফরয ছিল। এক বছর পর তাহাজ্জুদের ফরয বিধান রহিত হয়ে রমাযান এবং অন্যান্য মাসে নফল হিসেবে চলমান থাকে। সা’দ বিন হিশাম রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশা রাযি. কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের নামায সম্বন্ধে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি পাঠ করোনি {يا أيها المزمل}? তিনি বললেন, হ্যাঁ, পাঠ করেছি। আয়িশা রাযি. বললেন, যখন এ সূরাটির প্রথম অংশ অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবায়ে কেরাম রাতে নামায পড়তে শুরু করেন। ফলে তাঁদের পদদ্বয় ফুলে যায়। সূরার শেষ অংশ এগারো মাস আকাশে আবদ্ধ থাকে। এক বছর পর তা অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাতের নামায ফরয হওয়ার পর নফলে পরিণত হয়ে যায়।-সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস ১৩৪২

আয়িশা রাযি. এর হাদীস দৃষ্টে ইমাম বাগাভী রহ. বলেন, এই আয়াতের আলোকে তাহাজ্জুদ অর্থাৎ রাত্রির নামায রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সমগ্র উম্মতের উপর ফরয ছিল। এটা পাঞ্জেগানা নামায ফরয হওয়ার পূর্বের কথা। এই আয়াতে তাহাজ্জুদের নামায কেবল ফরযই করা হয়নি; বরং তাতে রাত্রির কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ নিযুক্ত থাকাও ফরয করা হয়েছে। কারণ আয়াতের মূল আদেশ হচ্ছে, কিছু অংশ বাদে সমস্ত রাত্রি নামাযে রত থাকা। উক্ত আয়াতের আদেশ পালনার্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ রাত্রি তাহাজ্জুদের নামাযে ব্যয় করতেন। ফলে তাঁদের পদদ্বয় ফুলে যায় এবং আদেশটি বেশ কষ্টসাধ্য প্রতীয়মান হয়। পূর্ণ একবছর পর সূরার শেষাংশ فاقرءوا ماتيسر منه অবতীর্ণ হলে দীর্ঘক্ষণ নামাযে দণ্ডায়মান থাকার বাধ্যবাধকতা রহিত করে দেয়া হয় এবং বিষয়টি ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়ে ব্যক্ত করা হয় যে, যতক্ষণ নামায পড়া সহজ মনে হয়, ততক্ষণ নামায পড়াই তাহাজ্জুদের জন্য যথেষ্ট। এই বিষয়বস্তু সুনানে আবূ দাউদ ও সুনানে নাসায়ীতে আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, মিরাজ রাত্রিতে পাঞ্জেগানা নামায ফরয হওয়ার আদেশ অবতীর্ণ হলে তাহাজ্জুদের আদেশ রহিত হয়ে যায়। তবে এরপরও তাহাজ্জুদ সুন্নাত থেকে যায়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন।-মা‘আরিফুল কুরআন (বাংলা) ১৪১৪

হাদীসটির পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। প্রশ্নটি হলো, তাহাজ্জুদ প্রথমে ফরয ছিল। এরপর তা নফল করা হয়। অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামায ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে জামাআতবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক পড়েননি। এখন যদি বলা হয়, তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ একই নামায তাহলে প্রশ্ন হয়, একই নামাযকে একবার ফরয করলেন এরপর আবার তার ফরয বিধান রহিত করে নফল করে দিলেন সেই নামাযের নফল বিধান রহিত করে দিয়ে আবার ফরয করে দিবেন বা দিতেন? ইসলামী শরীয়ার কোনো বিধানের ক্ষেত্রে কি এমনটি হয়েছে যে, একবার ফরয করে আবার নফল করা হয়েছে। এরপর আবার ফরয করা হয়েছে বা ফরয করার আশংকা বা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন তাহাজ্জুদ শেষ রাতে পড়তেন। মাসরুক রাযি. বলেন, আমি আয়িশা রাযি. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে কখন নামায আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, যখন গভীর রজনীতে মোরগের ডাক শুনতেন তখন নামায আদায় করতেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৩২

অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামায শুরু রাত্রে পড়তেন। আবূ যর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রোযা রাখতাম। তিনি আমাদের নিয়ে রমাযান মাসে রাতের নামায পড়েননি। তবে রমাযানের সাত দিন অবশিষ্ট থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামায পড়লেন। রমাযানের ছয় দিন বাকি থাকতে আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন না। আবার রমাযানের পাঁচ দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্ধ রাত্র পর্যন্ত আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমাদের সারা রাত নামায পড়ার সুযোগ দিতেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি ইমামের নামায শেষ পর্যন্ত তার সাথে নামায পড়ে তাহলে তখন তার আমল নামায় সারা রাত নামায পড়ার পুণ্য লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর রমাযানের চার দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন না। তবে রমাযানের তিন দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরিবার, স্ত্রী এবং অন্যান্য লোকদের একত্রিত করলেন এবং আমাদের নিয়ে সফলতা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত নামায পড়লেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সফলতা কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাহরীর সময়। এরপর রমাযানের অন্যান্য দিনগুলোতে আমাদের নিয়ে রাতের নামায পড়েননি।-সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস ১৩৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১০৯২

সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিয়ীগণও শুরু রাত্র থেকে তারাবীহ পড়া আরম্ভ করতেন :

হাসান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষ রমাযান মাসে নামায পড়ত। যখন রাতের একচতুর্থাংশ গত হয়ে যেত তখন ইশার নামায পড়ত। এবং যখন নামায থেকে ফিরে আসত তখন রাতের একচতুর্থাংশ অবশিষ্ট থেকে যেত।-মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস ৭৭৪০

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় তাহাজ্জুদ একাকী পড়তেন। কখনো লোকজন ডেকে জামাআত করতেন না। তবে যদি কেউ এসে দাঁড়িয়ে যেত তবে তিনি কিছু বলতেন না। যেমন ইবনে আব্বাস রাযি. নিজে একবার তাহাজ্জুদের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে তারাবীহ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এর জন্য কয়েকবার ডেকে ডেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাআত করেছেন। অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের জন্য পুরো রাত কখনো জাগ্রত থাকেননি। আয়িশা রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোর পর্যন্ত পূর্ণ রাত নামায পড়েননি এবং কোনো রাত্রে পূর্ণ কুরআন শরীফ পড়েননি।-সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস ১৩৪২

আয়িশা রাযি. এর এ বক্তব্য ছিল তাহাজ্জুদ বিষয়ে। নতুবা উপরে আবূ যর রাযি. এর বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবহে সাদিক পর্যন্ত তারাবীহ নামায পড়েছেন। আর আবূ যর রাযি. এর বর্ণনা সম্পর্কে আয়িশা রাযি. এর সম্যক ধারণা ছিল। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীদেরকে একত্রিত করে তারাবীহ নামায পড়েছেন। সুতরাং এ বিষয়টি আয়িশা রাযি. এর অগোচরে থাকার কোনো প্রশ্নই উঠে না। …..ফাতাওয়া রাশীদিয়া ৩৫২….

এরপর কথা হলো, সালাফী ভাইয়েরা আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. এর উদ্ধৃতি দিয়ে কি বুঝাতে চান? তারা কি বুঝাতে চান যে, কাশ্মিীরী রহ. যেহেতু জোর দিয়ে বলেছেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ এক নামায সুতরাং তার নিকটও তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যা বিশ রাকাআত নয়; আট রাকাআত? তবে শুনুন তাঁর তারাবীহ সংক্রান্ত আরেকটি বক্তব্য। কাশ্মীরী রহ. বলেন, ‘উমর রাযি. থেকে তারাবীহ নামাযের বিভিন্ন সংখ্যা বর্ণিত হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তমূলক চূড়ান্ত বক্তব্য হলো, তারাবীহ নামাযের রাকাআত সংখ্যা হলো বিশ রাকাআত; সাথে বিতরের তিন রাকাআত। মুয়াত্তা মালিকের বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমর রাযি. কিরাতকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়ে রাকাআত সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন। উম্মাহর সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়ে যাওয়ার পর এখন আমাদের জন্য আলোচনার সুযোগ নেই যে, এটা কি উমর রাযি. এর ইজতিহাদপ্রসূত কর্মপদ্ধতি ছিল? যে ব্যক্তি হাদীস অনুযায়ী আমল করতে চায় তার জন্য উত্তম হলো, সাফল্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সাহরীর সময় শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তারাবীহ নামায পড়বে। কারণ এটা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমাযানের শেষ দিনের নামায। আর যে ব্যক্তি আট রাকাআত তারাবীহকে যথেষ্ট মনে করে এবং বৃহত্তম জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এবং তাদেরকে বিদআতের অভিযোগে অভিযুক্ত করে তারা অবশ্যই তাদের পরিণতি দেখতে পাবে।-আনওয়ার শাহ আলকাশমিরী, ফাইযুল বারী ৪/৩৪১

এখানে উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, আমাদের সালাফী ভাইয়েরা তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ নামাযকে এক বলছেন এবং তা লোকসমাজে প্রচার করে চলছেন। অথচ তাদের দায়িত্বশীল আলেমগণ মনে করেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ ভিন্ন দু শ্রেণীর নামায। এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ গাইরে মুকাল্লিদ আলেম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর একটি আলোচনা প্রণিধানযোগ্য। মাওলানা আব্দুল্লাহ চকরালভী যখন তারাবীহ তাহাজ্জুদ নামায এক হওয়ার কথা প্রচার করতে আরম্ভ করে তখন মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী লিখেন‘… এই সুস্পষ্ট জবাব পেয়েও ওই মৌলভী সাহেব (চকরালভী) তা মানতে রাজি হননি; বরং জবাবের ‘জবাব’ তৈরির অনেক চেষ্টা করেছেন। তার সকল চেষ্টার সারকথা এই যে, প্রথম রাতের নামায এবং শেষ রাতের নামায বস্তুত একই নামায, দুই নামায নয়। তারাবীহ যা প্রথম রাতে পড়া হয় তার অপর নাম তাহাজ্জুদ। এ কথার জবাবে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এ দাবির পক্ষে কোনো দলীল নেই। বরং বিপক্ষে দলীল রয়েছে। কেননা তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থই হলো, ঘুম থেকে জেগে নামায আদায় করা। কামূসে রয়েছে, تهجد-استيقظ অর্থ : সে ঘুম থেকে জাগ্রত হলো। ‘রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানে এবং রমাযানের বাইরে এগারো রাকাআতের বেশি পড়তেন না।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, প্রথম রাত এবং শেষ রাতের নামায একই নামায; বরং এ হাদীস থেকে শুধু এটুকুই প্রমাণ হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাআত নামায পড়তেন।’- সানাউল্লাহ অমৃতসরী, আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯২-৯৩

অন্য দিকে রমাযান মাসে ইশার সাথে তারাবীহ নামায পড়ার পর তাহাজ্জুদ পড়া যাবে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে :
প্রশ্ন : যে ব্যক্তি রমাযান মাসে ইশার সময় তারাবীহ নামায পড়ল সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে পারবে কি না?
উত্তর : পারবে। কেননা তাহাজ্জুদের সময়ই হচ্ছে সুবহে সাদিকের আগে। প্রথম রাতে তাহাজ্জুদ হয় না।
প্রশ্ন : রমাযান মাসে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দুই নামায থাকে, না তারাবীহ নামাযই তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়ে যায়?
উত্তর : যদি তারাবীহ প্রথম রাতে আদায় করা হয় তবে তা শুধু তারাবীহ বলে গণ্য হয়। আর শেষ রাতে পড়লে তা তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়।-সানাউল্লাহ অমৃতসরী, ফাতাওয়া সানাইয়্যাহ : ১/৬৮২-৬৫৪

উপরোক্ত প্রশ্নোত্তর থেকে যে বিষয়গুলো উপলব্ধ হয় :
১. যে ব্যক্তি প্রথম রাতে তারাবীহ পড়ে সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদও পড়তে পারে। যেহেতু আজকাল সকল মানুষ প্রথম রাতেই তারাবীহ পড়ে থাকে তাই তাদের শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়া উচিত।
২. তাহাজ্জুদের সময় হলো রাতের শেষ ভাগে।
৩. প্রথম রাতের ইবাদতকে তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী বলা যায় না।
৪. কেউ যদি কখনো শেষ রাতে তারাবীহ পড়ে তবে তা তাহজ্জুদেরও স্থলবর্তী হবে। এ কথার আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মাওলানা সানউল্লাহ অমৃতসরীর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তারাবীহ তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হওয়ার কারণে এই দুইটি এক নামায হওয়া প্রমাণিত হয় না। যেমন জুমআর নামায জোহরের স্থলবর্তী হওয়ায় জুমআ- জোহর এক নামায প্রমাণিত হয় না।’ আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯৩
মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ অনূদিত ড. শাইখ মুহাম্মদ ইলয়াস ফয়সাল রচিত নবীজীর নামায ৩৭০-৩৭৩

লেখকের বক্তব্য ২

পুস্তিকাটির পঞ্চম অধ্যায়টি হলো, ‘বিভিন্ন প্রতারণা ও অপকৌশল’ সংক্রান্ত। পঞ্চম অধ্যায়টিকে লেখক সাতটি উপশিরোনামে বিভক্ত করেছেন। সপ্তম উপশিরোনামটি হলো, ‘হাদীস বিকৃতির দুঃসাহস’। এ শিরোনামে তিনি চারটি বিকৃতি (?) উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় বিকৃতিটি হলো, সহীহ বুখারী থেকে কিতাবু সালাতিত তারাবীহ (তারাবীহ নামাযের অধ্যায়) কে বিয়োজন করণ। লেখক মহোদয় এ একই বিষয়ে দু’টি জায়গায় আলোচনা করেছেন। (১) ‘হাদীস বিকৃতির দুঃসাহস’ উপশিরোনামের অধীনে। (২) পুস্তিকার শুরুতে ৮ নাম্বার পৃষ্ঠায়। আমরা যেহেতু পুস্তিকাটির শুরু থেকেই লেখকের আপত্তিকর বক্তব্যগুলোর উপর পর্যালোচনা উপস্থাপন করছি তাই লেখকের ৮ নাম্বার পৃষ্ঠার বক্তব্য উল্লেখ করে তার উপর পর্যালোচনামূলক আলোচনা করবো। এবং ঘনিষ্ঠ প্রাসঙ্গিকতায় সপ্তম শিরোনামের প্রথম বিকৃতিটি সম্বন্ধেও আমরা পর্যালোচনা তুলে ধরবো।

মুহতারাম লেখক তার পুস্তিকার আট নাম্বার পৃষ্ঠায় লেখেন,

‘বিশেষ করে ইমাম বুখারী (রহঃ) হাদীছটি كتاب صلاة التراويح ‘তারাবীহ্র ছালাত’ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। তিনি ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়ে ‘রমাযান ও অন্য মাসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদেও হাদীছটি উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও আরেকটি অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য যে, ইমাম বুখারী (রহঃ) উক্ত শিরোনাম উল্লেখ করলেও ভারত উপমহাদেশের ছাপা ছহীহ বুখারী থেকে তা বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ হল, প্রথমতঃ মুসলিম সমাজে মিথ্যাচার করা হয় যে, ‘আয়িশা (রাঃ)-এর উক্ত হাদীছে তাহাজ্জুদের কথা বলা হয়েছে’, ‘তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পৃথক ছালাত’, ‘তারাবীহ ২০ রাকাআত আর তাহাজ্জুদ ১১ রাকাআত’ ইত্যাদি। কিন্তু ইমাম বুখারীর শিরোনামের মাধ্যমে উক্ত দাবিগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত: ছহীহ বুখারীর পাঠ দান ও পাঠগ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ শিক্ষক-ছাত্র ও ওলামায়ে কেরামকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ ইমাম বুখারীর বিষয়টি যখন তারা বুঝতে পারবেন তখন তাদের নিকট বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, তারাবীহর ছালাত ৮ রাকাআত; ২০ রাকাআত নয়। তাই ন্যাক্কারজনক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ছল-চাতুরী করে ইসলামী শরী‘আতকে কখনো গোপন আল্লাহ তা‘আলা তার ছাপানোর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। (এ বাক্যটি বাউসা হেদাতী পাড়া, তেঁথুলিয়া, বাঘা, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১০ এ এভাবেই লেখা আছে। জানি না কোন ধরনের প্রমাদ এখানে কাজ করেছে। তবে সুধারণবশত বলা যেতে পারে যান্ত্রিক প্রমাদেই বাক্যটির এ দুরাবস্থা হয়েছে।) তাই সিরিয়া, মিসর, কুয়েত, লেবানন, সউদী আরবসহ অন্যান্য দেশে ছহীহ বুখারী যত বার ছাপানো হয়েছে সেখানেই উক্ত শিরোনাম বহাল রয়েছে, তা পুরাতন হোক আর নতুন হোক। আফসোস! হক্ব গোপন করার এই কৌশলী ব্যবসা আর কত দিন চলবে।!!”

পর্যালোচনা

আমরা শুরুতেই লেখকের বক্তব্যের উপর কোনো মন্তব্যে না গিয়ে হাদীস শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ‘বর্ণনার যুগ পরবর্তী সময় সম্পর্কিত আলোচনা’ এর সংক্ষেপিত একটু আলোচনা উপস্থাপন করতে চেষ্টা করবো।

সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী

ইমাম বুখারী রহ. থেকে তাঁর সহীহকে তাঁর যেসব শিষ্য শুনে বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলো,
১. আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আলফারাবরী (মৃত্যু ৩২০ হি.)। তিনি সহীহ বুখারী দুই বার শ্রবণ করেছেন। একবার ফারাবরে ২৪৮ হি. তে। দ্বিতীয়বার বুখারায় ২৫২ হি. তে।
২. ইবরাহীম বিন মা’কিল আননাসাফী (মৃত্যু ২৯৪ হি.)। তিনি সহীহ বুখারীর কিছু পৃষ্ঠা শ্রবণ করতে পারেননি। সে পৃষ্ঠাগুলো বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী রহ. থেকে অনুমতি নিয়ে।
৩. হাম্মাদ বিন শাকির আননাসাভী (মৃত্যু ২৯০/৩১১ হি.)। তাঁরও সহীহ বুখারীর কিছু অংশ ছুটে গেছে।
৪. আবূ তালহা মানসূর বিন মুহাম্মদ আলবাযদাভী (মৃত্যু ৩২৩ হি.)। ইমাম বুখারী রহ. থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ ব্যক্তি।
৫. কাযী হুসাইন বিন ইসমাঈল আলমাহামিলী (মৃত্যু ৩৩০ হি.)। তিনি বাগদাদে ইমাম বুখারীর কাছ থেকে সহীহ বুখারীর হাদীস শ্রবণ করেছেন। কিন্তু তখন তার কাছে সহীহ বুখারীর কোনো কপি ছিল না। ইমাম বুখারী রহ. যখন শেষবার বাগদাদে আসেন তখন তিনি হাদীস লেখানোর একটি মজলিস করেন। তখন মাহামিলী রহ. বুখারী রহ. থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। যারা মাহামিলী রহ. সূত্রে সহীহ বুখারীর হাদীস বর্ণনা করেছেন তারা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে চরম পর্যায়ের ভুল করেছেন।
ইমাম বুখারী রহ. থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্য হতে ফারাবরী রহ. হলেন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তৎকর্তৃক বর্ণিত সহীহ বুখারীর কপিটি সীমাহীন প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইবনে রশীদ রহ. বলেন, ফারাবরী রহ. কর্তৃক বর্ণিত সহীহ বুখারীর কপিটি ক্রমাগত পাঠদান হতে থাকে। ফলে মুসলিম সমাজ এ কপিটিকে লুফে নেয়। এবং এর উপর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।Ñড. মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম, রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী ১/১২

ফারাবরী রহ. থেকে যারা সহীহ বুখারী বর্ণনা করেছেন তারা হলেন,

১. আবূ আলী সাঈদ বিন উসমান বিন সাঈদ বিন সাকান
২. মুহাম্মদ বিন আহমদ আলমারওয়াযী
৩. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আলজুরজানী
৪. মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আসসারাখসী
৫. মুহাম্মদ বিন মাক্কী আলকুশমিহানী
৬. আহমদ বিন আহমদ আলআখসিক্তী
৭. মুহাম্মদ বিন উমার বিন শাব্বুইয়াহ
৮. ইসমাঈল বিন মুহাম্মদ আলকুশানী
৯. আবূ আহমদ আলহাম্মুভী
১০. ইবরাহীম বিন আহমদ আলমুস্তামলী

আলমুস্তামলী রহ. ৩১৪ হিজরী শতাব্দিতে সহীহ বুখারী শ্রবণ করেন। মুস্তামলী রহ. বলেন, আমি ফারাবরী রহ. এর কাছে রক্ষিত মূলকপি থেকে বুখারী রহ. এর সহীহ গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করি। তখন দেখি, ফারাবরী রহ. এর কপিটি এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাতে বেশ কিছু জায়গা শূন্য পড়ে আছে। তন্মধ্য হতে এমন কিছু অধ্যায়বৃত্তান্ত রয়েছে যার পরে কোনো কিছু লেখা নেই। এবং এমন কিছু হাদীস রয়েছে যেগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো অধ্যায়বৃত্তান্ত প্রস্তুত করা হয়নি। তখন আমি এসব অসঙ্গতির কিছু কিছু জায়গায় সংযোজন-বিয়োজন করে দিই।

আবূল ওয়ালিদ বাজী রহ. বলেন, উপরোক্ত উক্তি শুদ্ধ হওয়ার বড় প্রমাণ হলো, আবূ ইসহাক মুস্তামলী, আবূ মুহাম্মদ সারাখসী, আবূল হাইসাম কুশমিহানী এবং আবূ যায়দ মারওয়াযী এর কপিগুলোর মাঝে পূর্বাপরসহ বহু ব্যবধান রয়েছে। অথচ সবাই একটিমাত্র মূলকপি থেকে লিপিবদ্ধ করেছেন। এ ব্যবধানের কারণ হলো, প্রত্যেকেই যেকোনো জায়গা থেকে কাগজের টুকরো, চিরকুট ইত্যাদিতে অনুলিপি তৈরি করেছে। এরপর তার ভিতরে সবাই যার যার মত করে সংযোজন করেছে। এর প্রমাণ হলো, তুমি দেখবে কোনো কোনো কপিতে দুই বা ততোধিক অধ্যায়বৃত্তান্ত সংযুক্ত হয়ে আছে। এগুলোর মাঝে কোনো হাদীস নেই। আমি কথাগুলো এজন্যই উল্লেখ করলাম যে, আমাদের এলাকার মানুষগুলো অধ্যায়বৃত্তান্ত এবং হাদীসের মধ্যকার সমন্বয়ের মর্মার্থ অনুসন্ধানের ব্যাপারে খুব বেশি গুরুত্বারোপ করে থাকে এবং একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে এমন কৃত্রিমতার পরিচয় দেয় যা বৈধতার পর্যায়ে পড়ে না। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. আবূল ওয়ালীদ আলবাজী রহ. এর উক্তিটি উল্লেখ করার পর বলেন, অধ্যায়বৃত্তান্ত এবং হাদীসের মাঝে সমন্বয় বিধানের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গ্রহণযোগ্য কারণ। তবে এরকম ক্ষেত্র খুবই কম। -ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১/৩-৪, ১৫, আবুল ওয়ালীদ আলবাজী, আততা’দীল ওয়াত তাজরীহ ১/২৭২, ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম, রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী ১/১২

সহীহ বুখারীর কপিগুলোতে আমরা যে, ‘কিতাবু সালাতিত তারাবীহ’ দেখতে পাচ্ছি তা একমাত্র মুস্তামলী রহ. এর কপিতেই বিদ্যমান ছিল। আর ফারাবরী রহ. থেকে বর্ণনাকারী আর কারো কপিতে এই শিরোনামটির উপস্থিতি ছিল না। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, একমাত্র মুস্তামলীর বর্ণনাতেই এমনটি রয়েছে। এবং অন্যান্যদের বর্ণনা থেকে উক্ত শিরোনাম এবং বাসমালা বাদ পড়েছে। আইনী রহ. বলেন, একমাত্র মুস্তামলীর বর্ণনায় এমনটি রয়েছে। অন্যদের বর্ণনায় এমনটি পাওয়া যায় না।-ফাতহুল বারী ৪/২৯৫, উমদাতুলকারী ২১/২৮৮

উপরে সূত্রপরম্পরায় আলোচিত হয়েছে, ফারাবরী রহ. থেকে প্রাপ্ত কপিতে কিছু অসঙ্গতি ছিল। মুস্তামলী রহ. তাতে কিছুটা সংস্কার করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে কি করে দৃঢ় বিশ্বাস করা যায়, ‘কিতাবু সালতিত তারাবীহ’ শিরোনামটি ইমাম বুখারী রহ. কর্তৃক প্রদত্ত? ইমাম বুখারী রহ. থেকে অনুলিপিকারীদের মধ্য হতে ফারাবরী রহ. বিশুদ্ধ, ত্রুটিমুক্ত এবং পরিমার্জিত অনুলিপিকারী হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন। মুস্তামলী রহ. ব্যতীত অন্য কেউ ফারাবরী রহ. থেকে প্রাপ্ত কপিতে হাত দিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনা নেই। এক্ষেত্রে কোনো মুদ্রণকারী ব্যক্তি বা সংস্থা যদি ইবনে সাকান, আলমারওয়াযী, আলজুরজানী, আসসারাখসী, আলকুশমিহানী, আলআখসিক্তী, আলকুশানী প্রমুখ মহান ব্যক্তিদের কপি অনুসরণ করে সহীহ বুখারী ছাপেন তাহলে কি বলা যাবে ‘ছহীহ বুখারীর পাঠ দান ও পাঠগ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ শিক্ষক-ছাত্র ও ওলামায়ে কেরামকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ ইমাম বুখারীর বিষয়টি যখন তারা বুঝতে পারবেন তখন তাদের নিকট বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, তারাবীহর ছালাত ৮ রাকাআত; ২০ রাকাআত নয়। তাই ন্যাক্কারজনক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ছল-চাতুরী করে ইসলামী শরী‘আতকে কখনো গোপন (করা যায় না।) আল্লাহ তা‘আলা তার ছাপানোর ব্যবস্থা করে রেখেছেন।…আফসোস! হক্ব গোপন করার এই কৌশলী ব্যবসা আর কত দিন চলবে।!!’?

ভারতীয় প্রকাশক সংস্থা সহীহ বুখারী ছাপানোর ক্ষেত্রে এই কাজটি করেছেন। তারা মুস্তামলীর কপি অনুসরণ না করে অন্যদের কপি অনুসরণ করেছেন। আর অন্যদের কপিগুলোতে উক্ত শিরোনামটির অস্তিত্ব ছিল না। তো এতে কি করে ভারতীয় প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ ‘ ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা এবং হক গোপন করার কৌশলী ব্যবসা করা’র অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে গেলেন! এই অভিযোগগুলো প্রথমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে না করে ফারাবরী রহ. থেকে অনুলিপিকারী অন্যান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা প্রয়োজন ছিল। কারণ তারাই প্রথম তাদের কপিগুলোতে উক্ত শিরোনামটি বাদ দিয়েছেন (?!)। উপরন্তু সহীহ বুখারীর ভারতীয় কপিতে পার্শ্বটীকায় ‘কিতাবু সালাতিত তারাবীহ’ শিরোনামটি উল্লেখ করে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে, মুস্তামলীর বর্ণনায় এ শিরোনামটি রয়েছে এবং সেখানে শিরোনামটি না থাকলেও শিরোনামপূর্ব বাসমালাহ কিন্তু ঠিকই রয়েছে। বিসমিল্লাহকে বড় করে লিখে অন্যান্য অনুচ্ছেদ থেকে উক্ত শিরোনামাধীন অনুচ্ছেদটিকে আলাদা করে দেয়া হয়েছে।

ভারতীয় কপির শুরুতে অনুসরণীয় কপি সম্বন্ধে একটি বিশেষ জ্ঞাতব্যও দিয়ে দেয়া হয়েছে। জ্ঞাতব্যটির আরবী ভাষ্য নি¤œরূপ-
وقد استكمل تصحيح المتن والحواشى مطابقة للنسخة الصحيحة المصطفائية المشهورة المطبوعة فى سنة ১৩০৫ بعد جهد وسعى بليغ وصرف كثير والامرالملحوظ ان خط مطبوعنا هذا وقلمه وطرزه فائق على جميع المطبوعات السابقة من اول عهدنا الى يومنا هذا. (المكتبة الاشرفية ديوبند يوبى هند)
অর্থ : ১৩০৫ হিজরী শতাব্দিতে মুদ্রিত প্রসিদ্ধ এবং বিশুদ্ধ ‘মুসতাফায়ী কপি’র অনুসরণে সীমাহীন কষ্ট সাধনা এবং বহু সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করার পর সহীহ বুখারীর মূলপাঠ এবং পার্শ্বটীকা বিশুদ্ধ করণের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশেষ জ্ঞাতব্য বিষয় হলো, আমাদের মুদ্রিত কপির হস্তলিপি, তার লেখনী এবং তার লেখ্যরীতি আমাদের পূর্ব যুগ থেকে নিয়ে অদ্যাবধি মুদ্রিত পূর্বের সমস্ত কপি থেকে শ্রেষ্ঠ। (আলমাকতাবাতুল আশরাফিয়া, দেওবন্দ, ইউপি, ইন্ডিয়া)

সুতরাং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পূর্বে উপরোক্ত দাবির অসারতা প্রমাণ করা প্রয়োজন ছিল। তেমনিভাবে উপরোক্ত অভিযোগটি ‘মুস্তাফায়ী কপি’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও করা উচিৎ ছিল। কারণ ভারতীয় কপিটি ঐ কপিকে অনুসরণ করেই তৈরি করা হয়েছে।
ইমাম বুখারী রহ. তাঁর স্বসংকলিত কপির মাধ্যমে হাদীস বর্ণনা করতেন এবং শিক্ষার্থীরা তাঁর মাধ্যমে তাঁর সে কপি থেকে হাদীস শ্রবণ করতো এবং তাঁর জীবদ্দশায় তারা নিজেদের জন্য কপি তৈরি করে নিত। এতে প্রতীয়মান হয়, ইমাম বুখারী রহ. তাঁর কপিতে যা কিছু সংকলন করেছিলেন তাতে তিনি আস্থাশীল ছিলেন। তবে ইমাম বুখারী রহ. বেশ কিছু জায়গা ফাঁকা রেখে দিয়েছিলেন এ আশায় যে, পরবর্তীতে তিনি তাতে সংযোজন করবেন। কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি।-আব্দুর রাহমান বিন ইয়াহইয়া আলমুআল্লিমী, আলআনওয়ারুল কাশিফাহ ১/২৭৩

আমাদের কাছে যেটা মনে হচ্ছে, তা হলো, ইমাম বুখারী রহ. তার নিজস্ব কপিটিতে কিছু স্পেস রেখে দিয়েছিলেন। তার কারণ হলো, তিনি তার গ্রন্থগুলোকে একাধিকবার লিপিবদ্ধ করতেন। এটা রচনার ক্ষেত্রে তার সূক্ষ্ম দৃষ্টি এবং বিশেষ মনোনিবেশের প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণ তিনি যা লিখতেন এবং বর্ণনা করতেন তা ক্রমাগত পরিমার্জন এবং সম্পাদনা করতেন। ফলে তাঁর গ্রন্থগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার ব্যাপারে তিনি আস্থাশীল হতেন। উপরোক্ত নানা ধাপের মধ্য দিয়ে তার কপিগুলো বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। অথচ তখন তিনি তার গ্রন্থালয় এবং গ্রন্থপুঞ্জি থেকে যোজন দূরে অবস্থান করছিলেন। ফলে সে স্পেসগুলো পূর্ণ করার সুযোগ তাঁর হয়নি।-ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম, রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী ১/১২

সারাখসী, কুশমিহানী সূত্রে বর্ণিত আবূ যর রহ. এর কপি থেকে عن أبي هريرة عن ربه عز وجل এ সূত্র অংশের মধ্য হতে عن النبي صلى الله عليه وسلم অংশটি বাদ পড়ে গেছে। কিন্তু মুস্তামলীসহ অন্যদের কপিগুলোতে ঠিকই বহাল রয়েছে। কাযী ইয়াজ আসিলী রহ. এর উদ্ধৃতিতে বলেন, عن النبي صلى الله عليه وسلم অংশটুকু ফারাবরীর মূলকপিতে ছিল না। আবদূস রহ. অংশটুকু সংযুক্ত করেছেন।-আবূ ইউসুফ মুহাম্মদ যায়েদ, আলজাওয়াহিরুল হুরাইরিয়্যাহ মিন কালামি খাইরিল বারিয়্যাহ ২/৪৩৫

সহীহ বুখারীর কিছু কিছু জায়গায় ফারাবরী এর নিজস্ব বক্তব্যও এসেছে। এমনি একটি বক্তব্য প্রসঙ্গে আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. বলেন, এটা বুখারী রহ. এর বক্তব্য নয়। এটা অনুলিপিকারী সংযুক্ত করেছেন। ফারাবরীর এ সূত্রটি ইমাম বুখারীর সূত্র ভিন্ন অন্য একটি সূত্র। অনেক ক্ষেত্রে ফারাবরী রহ. এমনটি করে থাকেন। কারণ তিনি যখন বুখারীর সূত্র ব্যতীত নিজস্ব কোনো সূত্র পান তখন তিনি তা উল্লেখ করে দেন। ফাইযুল বারী শারহু সহীহিল বুখারী ১/২২২

আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. আরো বলেন, সহীহ বুখারীর ১৯ টি কপি রয়েছে। তন্মধ্য হতে একটা হলো কারীমা বিনতে আহমদ রহ. এর কপি। কারীমা বিনতে আহমদ হলো একজন মুহাদ্দিস রমণী। সহীহ বুখারীর অনুলিপিকারীদের মধ্য হতে তিন জন হানাফী মাসলাকের অনুসারী ছিলেন। ১. ইবরাহীম বিন মা’কিল নাসাফী। তিনি ইমাম বুখারীর সরাসরি ছাত্র ছিলেন। ২. হাম্মাদ বিন শাকির। ৩. শামসুদ্দীন সাগানী। আমার মতে শামসুদ্দীন সাগানী রহ. এর কপিটি বেশি নির্ভরযোগ্য ছিল। কারণ তিনি বলেন, বুখারী রহ. এর কাছে যে কপিটি পাঠ করা হয়েছে সে কপি থেকে আমি প্রতিলিপি প্রস্তুত করেছি।… জেনে রেখো, কপির ভিন্নতার কারণে মর্মার্থও ভিন্ন হয়ে যায়। তার কারণ হলো শিক্ষার্থীরা যখন গ্রন্থকার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছে তখন তারা মূল হাদীস গ্রহণ করেছে। প্রাসঙ্গিক বৈশিষ্টগুলোর প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এবং এ বিষয়টিকে তারা ঐচ্ছিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে যে যার মত করে বর্ণনা করেছে। এ সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক অবগত।-ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম, রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী ১/২১

সহীহ বুখারীর বর্ণনা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে যাওয়া এবং বর্ণনাকারীদের কপির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সংযোজন-বিয়োজন, অগ্র-পশ্চাত এবং বিলুপ্তিসহ নানা রকম ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। সহীহ বুখারীর উৎকৃষ্ট এবং নির্ভুল অনুলিপিকারীরূপে প্রসিদ্ধি লাভকারী হাফেয ইউনিনী রহ. বলেন, সহীহ বুখারীতে অধ্যায় বৃত্তান্ত, হাদীস এবং শব্দের মাঝে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে।-ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম, রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী ১/৩৮-৩৯

ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুল কারীম রহ. রচিত ‘রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী’ তে অধ্যায় এবং অনুচ্ছেদ শিরোনামের সংযোজন-বিয়োজন এবং অগ্র-পশ্চাত করণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বর্ণনার বিভিন্নতা শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় প্রস্তুত করা হয়েছে। অধ্যায়টির আরবী পাঠ নিম্নরূপ :خامساً : اختلاف الروايات في عناوين الكتب والأبواب إثباتاُ وحذفاً وتقديماً وتأخيراً، ونحو ذلك রিওয়াইয়াতু ওয়া নুসাখুল জামিয়িস সাহীহ লিলবুখারী ১/৬৭। এতে অনেকগুলো উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখানো হয়েছে, অনুচ্ছেদ শিরোনামের বিষয়টি কোনো কোনো কপিতে গিয়ে অধ্যায় শিরোনামে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং আপত্তিকর ভাষায় অভিযোগ তোলার পূর্বে লেখকের জন্য সহীহ বুখারীর কপিগত ব্যবধান বিষয়ক আলোচনা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করা নিতান্ত প্রয়োজন ছিল।

লেখকের বক্তব্য : ৩

‘হাদীস বিকৃতির দুঃসাহস’ উপশিরোনামের দ্বিতীয় বিকৃতিটি হলো সুনানে আবূ দাউদের একটি বর্ণনার নুসখা বা কপিগত পরিবর্তন পরিবর্ধন। এ বিকৃতি সম্বন্ধে আলোচনার শুরুতে লেখক ছোট্ট একটি গৌরচন্দ্রিকা টেনেছেন। গৌরচন্দ্রিকাটি বেশ চমকপ্রদ বলে মনে হয়েছে। তাই লেখকের ভূমিকাটি দিয়েই আমরা আমাদের মূল আলোচনা শুরু করি। লেখক বলেন,
‘দলীয় গোঁড়ামী মানুষকে অন্ধ ও বধির করে ফেলে। উপমহাদেশের মাযহাবী আলেমগণের অনেকে উক্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিজেরা বিভ্রান্ত হয়েছেন, অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত করেছেন। কোনভাবে যখন ছহীহ হাদীছের হুকুম খ-ন করা সম্ভব হয়নি তখন হাদীছের শব্দ, বাক্য, শিরোনাম বিকৃতি করতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেননি। হাদীছের পরিবর্তন, বৃদ্ধিকরণ, হ্রাসকরণ সর্বক্ষেত্রেই উৎসাহ প্রদান করেছে মাযহাবী সংকীর্ণতা। শুধু তারাবীহ সংক্রান্ত নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হ’ল-’ (পৃষ্ঠা ৮২)

এরপর লেখক তাঁর মূল আলোচনা শুরু করেছেন এভাবে,
‘(এক) হাদীছের প্রধান ছয়টি গ্রন্থে ২০ রাকাআতের কোন হাদীছ নেই। অথচ আবূ দাউদের উদ্ধৃতি পেশ করা হয়ে থাকে। কারণ হ’ল দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসার প্রধান শিক্ষক শাইখুল হিন্দ নামে খ্যাত মাওলানা মাহমূদুল হাসান (১২৩৮-১৩৩৮ হিঃ) সুনানে আবূ দাউদের একটি হাদীছের শব্দ পরিবর্তন করেছেন। যদিও হাদীছটি ইমাম আবূ দাউদসহ অন্যান্য মুহাদ্দিছগণের নিকট যঈফ। মূল হাদীছটি হ’ল- عن الحسن أن عمر بن الخطاب جمع الناس على أبي بن كعب، فكان يصلى لهم عشرين ليلة
হাসান থেকে বর্ণিত, ওমর (রাঃ) উবাই ইবনু কা‘বের মাধ্যমে লোকদের একত্রিত করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে ২০ রাত্রি ছালাত আদায় করান। উক্ত হাদীছের টীকায় মাওলানা মাহমূদুল হাসান নিজের পক্ষ থেকে শব্দ তৈরি করে বলেছেন, অন্য বর্ণনায় عِشْرِينَ رَكْعَةً ‘বিশ রাকাআত’ রয়েছে। এই বিকৃতি শব্দেই দিল্লী ‘মুজতবাই প্রেস’ আবূ দাউদ ছাপায়। অতঃপর মাওলানা খায়রুল হাসান আবূ দাউদ শরীফের টীকা লিখতে গিয়ে ‘বিশ রাকাআত’ মিথ্যা কথাটুকু মূল হাদীছের সাথে যোগ করেন এবং হাদীছের শব্দ عشرين ليلة ‘বিশ রাত’ টীকায় যোগ করেন। যা দিল্লী মজীদী প্রেস থেকে ছাপানো হয়। উক্ত সংস্করণটি ১৯৮৫ সালে দেওবন্দের ‘আসাহহুল মাতাবে’ প্রেস কর্তৃক ছাপা হয়, যা আজও পর্যন্ত সমগ্র ভারত উপমহাদেশে পড়ানো হচ্ছে। অথচ তার পূর্বে ১২৬৪ হিজরীতে দিল্লী মুহাম্মাদী প্রেস, ১২৭২ হিজরীতে দিল্লী কাদেরী প্রেস সহ মধ্যপ্রাচ্য তথা মিশর, সিরিয়া, লেবানন, কুয়েত, সউদী আরব প্রভৃতি রাষ্ট্রে প্রকাশিত আবূ দাউদের কোন একটিতেও ঐ মিথ্যা শব্দ নেই।’ (পৃষ্ঠা ৮৩)

পর্যালোচনা

লেখক মহোদয় উপরোক্ত বিকৃতি সংক্রান্ত তথ্য আহরণ করেছেন ‘ইবনে আহমাদ সালাফী, আহলে হাদীসের প্রকৃত পরিচয় (কলিকাতা : সালাফী প্রকাশনী, ১নং মারকুইস লেন, ২য় সংস্করণ ঃ ১৯৯৭), পৃঃ ৬৬-৬৭।’ থেকে। এবার আমরা লেখকের সহযোগিতার্থে তাঁর তথ্যসূত্রটিকে আরেকটু শক্তিময় করে তুলতে চাচ্ছি।

ড. মুহাম্মদ যিয়াউর রহমান আ’যমী সাহেব মদীনা ভার্সিটির একাডেমিক ম্যাগাজিনের একটি সংখ্যায় একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি এ তথ্য বিকৃতির (?) বিষয়টি তুলে ধরেন। খুব সম্ভব লেখক ও ইবনে আহমাদ সালাফী সাহেবের মূলসূত্র এ ম্যাগাজিন। সারকথা, ড. যিয়াউর রহমান আ’যমী, লেখক এবং তাদের সহমত পোষণকারীদের মূল বক্তব্য হলো, শাইখুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী রহ. নিজের পক্ষ থেকে শব্দ তৈরি করে عشرين ليلة (বিশ রাত) কে عِشْرِينَ رَكْعَةً (বিশ রাকাআত) বানিয়েছেন। তার এ জাল কার্যক্রম টীকা-টিপ্পনীর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মাওলানা খায়রুল হাসান সাহেব এসে টীকার মিথ্যা কথাটুকু হাদীসের মূল পাঠের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছেন। এ হলো তাদের সারবক্তব্য।

এদিকে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের ৭ তারিখ সকাল ৬টা ৩৮ মিনিটে উমর আলী ইবনে ইউসুফ সাহেব ‘মুলতাকা আহলিল হাদীস’ নামের একটি জনপ্রিয় আরব সাইটে একটি নিবন্ধ পোষ্ট করেন। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল, ‘তালাবুর রদ্দি ওয়াত তাওযীহ মিন মান ইয়াকুলু বিকওলিশ শাইখিল আলবানী ফি কিয়ামিল্লাইলি ওয়া সালাতিত তারাবীহ’ (কিয়ামুল লাইল এবং তারাবীহ নামাযের ব্যাপারে শাইখ আলবানী রহ. কে যারা সমর্থন করেন তাদের থেকে জবাব এবং সুস্পষ্ট বক্তব্য কামনা)। নিবন্ধটিতে তিনি বেশ চমৎকার আলোচনা করেন। সেখানে তিনি ড. যিয়াউর রহমান আ’যমী সাহেবের উপরোক্ত আপত্তির জবাব দিতে গিয়ে বলেন,
‘…ইমাম যাহাবী রহ. (৭৪৮) তাঁর সিয়ারু আ’লামিন নুবালা গ্রন্থে উবাই ইবনে কা’ব রাযি. এর জীবনীতে عشرين ليلة (বিশ রাত) এর পরিবর্তে عِشْرِينَ رَكْعَةً (বিশ রাকাআত) শব্দটি উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, সুনানে আবূ দাউদে আছে, ইউনুস ইবনে উবাইদ হাসান রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. রমাযানের নিশিকালীন নামাযে লোকদেরকে উবাই ইবনে কা’ব রাযি. এর পেছনে একত্রিত করে দিলেন। ফলে তিনি তাদেরকে নিয়ে বিশ রাকাআত নামায পড়তেন।’ এবং ইমাম হাফেয ইবনে কাসীর রহ. (৭৭৪) জামিউল মাসানীদের ১ নম্বর খ-ের ৮৬ নম্বর পৃষ্ঠায় বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন : উমর রাযি. উবাই রাযি. এর পেছনে লোকদেরকে একত্রিত করেছেন। ফলে তিনি তাদেরকে নিয়ে বিশ রাকাআত নামায পড়েছেন।’

সিয়ারু আ’লামিন নুবালাতে ইমাম যাহাবী রহ. এর আরবী বক্তব্য নিম্নরূপ :
(وَفِي “سُنَنِ أَبِي دَاوُدَ” يُوْنُسُ بنُ عُبَيْدٍ، عن الحسن أن عمر بن الخطاب جمع النَّاسَ عَلَى أُبي بنِ كَعْبٍ فِي قِيَامِ رمضان فكان يصلي بهم عشرين ركعة.)
আমরা শাইখ শুআইব আলআরনাউত রহ. এর তাহকীক কৃত সিয়ারু আ’লামিন নুবালা গ্রন্থটি খুলে দেখেছি। সেখানে ১/৪০০ পৃষ্ঠায় অবিকল উপরোক্ত বক্তব্যই উল্লেখিত হয়েছে। অণু পরিমাণও ব্যবধান নেই। উপরন্তু শাইখ শুআইব আল আরনাউত রহ.ও সুনানে আবূ দাউদের عشرين ركعة শব্দযুক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করে সনদ বিষয়ক সামান্য আলোচনাও করেছেন।

হাফেয ইমাম ইবনে কাসীর রহ. তাঁর জামিউল মাসানীদ গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। একটু কষ্ট হলেও মূল গ্রন্থটি অনুসন্ধান করে খুলে দেখেছি। হাদীস উপস্থাপনায় হাফেয ইবনে কাসীর রহ. এর বক্তব্য নিম্নরূপ :

হাসান ইবনে আবূল হাসান বসরী এর সূত্রে উবাই ইবনে কা’ব রাযি. এর বিবরণ :
হুশাইম আমাকে বর্ণনা করেছেন, তাঁকে ইউনুস বর্ণনা করেছেন, সে হাসান সূত্রে বর্ণনা করেন, উমর রাযি. লোকদেরকে উবাই ইবনে কা’ব রাযি. এর ইমামতে লোকদের জড়ো করলেন। ফলে তিনি তাদের নিয়ে বিশ রাকাআত নামায পড়তেন। এবং ইমাম আবূ দাউদ শুজা’ ইবনে মাখলাদ থেকে, সে হুশাইম থেকে, সে ইউনুস ইবনে উবাইদ থেকে, সে হাসান থেকে, সে উবাই থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (৩৫)

জামিউল মাসানীদ, ইমাম ইবনে কাসীর, মাসানীদু উবাই ইবনে কা’ব অধ্যায়, খ- ১, পৃ. ২৫৫, হাদীস নাম্বার ২৬, লেবাননস্থ দারুল ফিকর প্রকাশনী, ড. আব্দুল মু’তী আমীন কালআজী কর্তৃক টীকাকৃত

মুহাম্মদ আলী সাবুনী তাঁর ‘আলহাদইউন নববী আসসহীহ লিসালাতিত তারাবীহ’ নামক পুস্তিকার ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় সুনানে আবূ দাউদের এ বিশ রাকাআত সংক্রান্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমাদের কিছু সালাফী ভাই তাঁর উপর চড়াও হয়েছেন। কারণ, কেন তিনি এ মিথ্যা এবং বিকৃত বর্ণনা উল্লেখ করলেন? এবং তারা বলেছেন মুহাম্মদ আলী সাবুনী সাহেবই প্রথম হিন্দুস্তানী আলেমদের জালকৃত এবং বিকৃত বর্ণনাটি ব্যবহার করলেন। ফল কি দাঁড়ালো? আমরা আপাতত কোন বর্ণনাটি শুদ্ধ আর কোনটি অশুদ্ধ, কোনটি প্রণিধানযোগ্য আর কোনটি প্রণিধানযোগ্য নয় এ জটিল সমীকরণে যেতে চাচ্ছি না। এখানে সুস্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, হাদীস বিকৃতি ও জাল করার দায়ে হিন্দুস্তানের মাওলানা মাহমূদুল হাসান রহ. এবং মাওলানা ফখরুল হাসান রহ.ই প্রথম অভিযুক্ত নন। বরং অভিযোগ সত্য হলে হাদীস ও ইতিহাস শাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম ইবনে কাসীর রহ. (মৃত্যু ৭৭৪হি.) এবং ইমাম যাহাবী রহ. (মৃত্যু ৭৪৮হি.)-ই হলেন প্রথম শ্রেণীর অভিযুক্ত ব্যক্তি। এমন কি সমকালীন হাদীস শাস্ত্রের প্রাণপুরুষ শাইখ শুআইব আল আরনাউত রহ.ও এ অভিযোগ থেকে মুক্ত নন । সুতরাং অভিযোগ সত্য হলে হিন্দুস্তানী উলামায়ে কেরাম মূলত বিকৃতি ও জাল করার মহৎ (?) কাজটি আঞ্জাম দেননি। বরং তারা এক্ষেত্রে ইমাম যাহাবী ও ইমাম ইবনে কাসীর রহ. এর মত জগতখ্যাত ব্যক্তিত্বদের অনুসরণ করেছেন মাত্র। এতে যদি কোনো দায় সৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে প্রথম দায়বদ্ধ হবেন ইবনে কাসীর এবং যাহাবী রহ. এর মত মহীরূহগণ।

লেখকের বক্তব্য : ৪

লেখক মহোদয় তাঁর পুস্তিকার দশ নাম্বার পৃষ্ঠায় আট রাকাআত তারাবীহর পক্ষে দ্বিতীয় দলীলটি উল্লেখ করেছেন। দলীলটির আরবী পাঠ নিম্নরূপ-
أخبرنا أبو يعلى قال حدثنا أبو الربيع الزهراني قال حدثنا يعقوب بن عبد الله القمي قال حدثنا عيسى بن جارية عن جابر بن عبد الله قال صلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم في شهر رمضان ثمان ركعات وأوتر فلما كانت الليلة القابلة اجتمعنا في المسجد ورجونا أن يخرج فيصلي بنا فأقمنا فيه حتى أصبحنا فقلنا يا رسول الله رجونا أن تخرج فتصلي بنا قال إني كرهت – أو خشيت – أن يكتب عليكم الوتر
অর্থ : ঈসা বিন জারিয়া রাযি. জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাযি. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, রমাযানের একরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে আট রাকাআত এবং বিতর পড়লেন। পরদিন আমরা মসজিদে একত্রিত হলাম। আশা করছিলাম, তিনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন এবং আমাদের নিয়ে নামায পড়বেন। এভাবে সকাল হয়ে গেলে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, আশা করছিলাম, আপনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন এবং আমাদের নিয়ে নামায পড়বেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আশঙ্কা করেছিলাম, তোমাদের উপর বিতর ফরয করে দেয়া হবে। সহীহ ইবনে খুজাইমা ২/১৩৮/১০৭০

পর্যালোচনা

ক. হাদীসটির সূত্রানুগ আলোচনা :

হাদীসটির সনদ-সূত্রে ঈসা বিন জারিয়া নামের একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। হাদীস শাস্ত্রের কতিপয় ইমাম তাকে মাতরুক এবং মুনকারুল হাদীস বলে অভিহিত করেছেন। মাতরূক অর্থ পরিত্যাজ্য; যার বর্ণনা দলীল বা সমর্থক দলীল কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুনকারুল হাদীস হলো, এমন একজন বর্ণনাকারী যিনি ভুল বা আপত্তিকর কথাকে ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইমাম ইবনে আদী রহ. উপরোক্ত হাদীসটিকে গায়রে মাহফুজ (অরক্ষিত) সাব্যস্ত করেছেন। ইবনে আদী রহ. এর পরিভাষায় গায়রে মাহফুজ শব্দটি মুনকার বা বাতিল বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইমাম আবূ দাউদ রহ. বলেন, তাঁর বর্ণনায় বহু মুনকার হাদীস রয়েছে। মুনকার যয়ীফ হাদীসেরই একটি প্রকার। তবে তা এতটাই দুর্বল যে, এর দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা বিধিত নয়। বিস্তারিত জানতে দেখা যেতে পারে, তাহযীবুল কামাল ১৪/৫৩৩, আল-কামিল, ইবনে আদী ৬/৪৩৬, আয-যুআফাউল কাবীর, উকাইলী ৩/৩৮৩; ইতহাফুল মাহারাহ বি আতরাফিল আশারাহ, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/৩০৯

যদিও হাদীসটিকে শাইখ আলবানী রহ. হাসান লিগাইরিহী বলে অভিহিত করেছেন। অথচ তিনি অসংখ্য সহীহ হাদীসকেও মওযু বা যয়ীফ বলেছেন! হাবীবুর রহমান আ’জমী রহ.ও সহীহ ইবনে খুজাইমা এর টীকায় ঈসা ইবনে জারিয়া এর ব্যাপারে মৃদু আপত্তি করে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হলো, হাদীসটি যঈফ।

উপরন্তু হাদীসটিতে বলা হয়েছে, এটি রমাযানের এক রাতের ঘটনা। আর সে সময় জামাআতবদ্ধ তারাবীহ এর প্রচলন ছিল না। সে হিসেবে বর্ণনাটি সহীহ ধরে নেয়া হলেও একথা বলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, অবশিষ্ট রাকাআতগুলো একাকি পড়ে নেয়া হয়েছে। আর এটা নিছক কোনো অনুমান বা সম্ভাবনা নয়; সহীহ মুসলিমে এ ধরনের একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটিতে বলা হয়েছে, আনাস রাযি. বলেন, রমাযানের এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়ছিলেন। আমি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে দাঁড়িয়ে যাই। এরপর আরেকজন আসে। সে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। এরপর আরেকজন আসে। এভাবে একটি জামাআতে পরিণত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অনুধাবন করতে পারলেন, আমরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছি তখন নামাযকে সংক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর নিজ গৃহে গিয়ে আরো কিছু নামায পড়লেন যা আমাদের কাছে পড়েননি। ভোর হলে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, গত রাতে কি আমাদের উপস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। এবং তোমাদের এ ব্যাপারটিই আমাকে আমার কৃত কার্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। সহীহ মুসলিম ৩/১৩৪/২৬২৫
হাদীসটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘এরপর নিজ গৃহে গিয়ে আরো কিছু নামায পড়লেন যা আমাদের কাছে পড়েননি।’

সার কথা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অস্পষ্ট বক্তব্য সম্বলিত একটি মুনকার ও দুর্বল বর্ণনাকে উপরোক্ত অকাট্য দলীলসমৃদ্ধ এবং সর্বসম্মত একটি বক্তব্যের বিপক্ষে দাঁড় করানো আদৌ যথার্থ নয়। উপরন্তু যদি হাদীসটি সহীহ হতো এবং এর দ্বারা আট রাকাআত তারাবীহ প্রমাণিত হতো তাহলে হযরত জাবের রাযি. ই তো সর্বপ্রথম বিশ রাকাআতের বিপক্ষে এই হাদীসটি উপস্থাপন করতেন।

খ. লেখকের সনদ বিষয়ক আলোচনার বিশ্লেষণ

মুহতারাম লেখক ঈসা ইবনে জারিয়া রহ. এর উপরোক্ত হাদীসটি উল্লেখ করার পর বলেন, ‘হাদীছটি কয়েকটি সূত্রে হাসান সনদে বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮) তাঁর ‘মীযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে হাদীছটি উল্লেখ করার পর বলেন, ‘হাদীছটির সনদ উত্তম স্তরের’ অর্থাৎ হাসান। শাইখ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, ‘হাদীছটির সনদ হাসান’।

ইমাম যাহাবী রহ. এর আরবী ভাষ্য হলো, اسناده وسط । লেখক মহোদয় এর অর্থ করেছেন ‘হাদীছটির সনদ উত্তম স্তরের’। অর্থটি যথার্থ হয়নি। কারণ এর শাব্দিক অর্থ করলে অর্থ হবে হাদীসটির সনদ মধ্যম পর্যায়ের। সব মধ্যমই উত্তম হয় না। তাছাড়া ওয়াসাত শব্দটি হাদীসবেত্তাদের পরিভাষায় কি অর্থে ব্যবহৃত হয় সেদিকটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন ছিল। এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা, বর্ণনাকারীর অবস্থাভেদে হাদীসের বিধান আরোপিত হয়। এবার ওয়াসাত স্তরের বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে হাদীসবেত্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি তা জেনে নেয়া যাক।

১. বারযায়ী রহ. বলেন, আমি আবূ যুরআ রাযী রহ. কে ইসমাঈল বিন মুজালিদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, সে কেমন? তখন তিনি বললেন, সে একেবারে মিথ্যাবাদীদের পর্যায়ভুক্ত নয়; ওয়াসাত পর্যায়ের।-উবাইদুল্লাহ বিন আব্দুল কারীম, আযযুআফা ওয়া আজউইবাতু আবি যুরআ রাযী আলা সুওয়ালাতি বারযায়ী ১/৪০
২. ইয়াকুব বিন শাইবা রহ. কোনো কোনো হাদীসের ক্ষেত্রে বলেন, এর সনদ মধ্যম পর্যায়ের; প্রমাণিত নয় এবং বাজেয়াপ্তও নয়; সহায়ক পর্যায়ের।-ইমাম সাখাবী রহ., আলগায়াহ ফি শারহিল হিদায়াহ ফি ইলমির রিওয়াইয়াহ ১/৮৩
৩. সাঈদ ইবনে জামহান সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রহ. সাদুকুন ওয়াসাতুন বলে মন্তব্য করে চূড়ান্ত মন্তব্যে বলেন, আবূ হাতিম রহ. বলেন, এর বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যাবে না।-আলকাশিফ ফি মা’রিফাতি মান লাহু রিওয়াইয়াতুন ফিল কুতুবিস সিত্তাহ ১/১৩২
৪. ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রহ. আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ সম্পর্কে বলেন, এ হলো ওয়াসাত স্তরের বর্ণনাকারী। আর ওয়াসাত শব্দটি তা‘দীল এর পঞ্চম স্তরের একটি শব্দ। আর এ স্তরের বর্ণনাকারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না। বরং এদের হাদীস দ্বারা শুধু প্রমাণ সহায়তা গ্রহণ করা যায়।-বুহুসুন ফিল আহাদীসিয যায়ীফা ২/৫
৫. আলী ইবনুল মাদীনী এবং পরবর্তী হাদীসবেত্তাদের মধ্য হতে ইমাম যাহাবী রহ. এর বক্তব্যে ‘ওয়াসাত’ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তো এটা কি তা’দীল পর্যায়ের শব্দ? শাব্দিক অর্থ থেকে প্রতীয়মান হয়, ওয়াসাত বিশেষণে বিশেষিত বর্ণনাকারী তা’দীল এবং তাজরীহ এর মধ্যবর্তী স্তরের ব্যক্তি। যে ব্যক্তি এ স্তরের হবে তাকে তা’দীল স্তরে উন্নীত করা সমীচীন হবে না। যেমনিভাবে একে জরহের স্তরেও নামিয়ে দেয়া যাবে না। তো এধরনের হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা প্রাধান্য দানকারী অন্যান্য হাদীসের উপর নির্ভরশীল। আর তা হলো মুতাবিআত এবং শওয়াহেদ হাদীস। এ ভিত্তিতেই বলা হয়, ওয়াসাত পর্যায়ের বর্ণনাকারী সালিহুল হাদীস স্তরভুক্ত যাদের হাদীস দ্বার প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না। তবে প্রমাণ সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এ ধরনের কয়েকটি ব্যবহার নিম্নে প্রদত্ত হলো,

ক. ইয়াযীদ বিন কাইসান ইয়াশকুরী সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আলকাত্তান বলেন, সে নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনাকারী নয়। সে সালিহ ওয়াসাত স্তরের বর্ণনাকারী।
খ. মুহাম্মদ বিন যাবারকান সম্পর্কে আবূ যুরআ রাযী রহ. বলেন, সে সালিহ এবং ওয়াসাত স্তরের বর্ণনাকারী। আমি বলি, এধরনের বাক্য প্রমাণ করে যে, এ স্তরের বর্ণনাকারীর হাদীস গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রমাণ উপস্থাপনের উপযোগী নয়।-আব্দুল্লাহ আলজুদাই, তাহরীরু উলূমিল হাদীস ৩/৭৮
গ. ইয়া’কুব বিন শাইবাহ রহ. বলেন, ওয়াসাত স্তরের ইসনাদ; প্রমাণিতও নয় এবং পরিত্যাজ্যও নয়। অর্থাৎ সালিহ পর্যায়ের। কখনো এটা দ্বারা সহায়তা গ্রহণ করা হয়।- ইমাম সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ১/৭৫
ঘ. যে বর্ণনাকারী সম্পর্কে ‘শাইখুন ওয়াসাতুন’ শব্দ ব্যবহার করা হয় তদবর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণসহায়তার যাবতীয় শর্ত পালন সাপেক্ষে প্রমাণ সহায়তা গ্রহণ করা যাবে। এককভাবে এর দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা যাবে না।-লিসানুল মুহাদ্দিসীন ২/২৯১
ঙ. ইয়াযীদ বিন কাইসান ইয়াশকুরী সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আলকাত্তান বলেন, সে নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনাকারী নয়; সে সালিহ ওয়াসাত স্তরের বর্ণনাকারী।-ইমাম যাহাবী, মিযানুল ই’তিদাল ৭/৩৫৯

এতো গেল, ওয়াসাত শব্দটি সম্বন্ধে মুহাদ্দিসীনে কেরামের কিছু মন্তব্য। এতে পরিষ্কার হলো, এ শব্দটিকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকেন। দু একজন ইমাম শব্দটিকে হাসান উপযোগী শব্দ হিসেবে বিবেচনা করলেও অধিকাংশের মত কিন্তু বিপরীত মেরুর। এমন কি ওয়াসাত শব্দ সম্বন্ধে আমাদের আলোচ্য ইমাম -যার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এ আলোচনার সূত্রপাত- ইমাম যাহাবী রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গিও কিন্তু মধ্যম স্তরের নয়। যা তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

এবার আমরা আলোচিত বর্ণনাকারী ঈসা ইবনে জারিয়া সম্বন্ধে রিজাল শাস্ত্রবিদদের কিছু মন্তব্য তুলে ধরবো।

১. ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, ঈসা ইবনে জারিয়া একজন বিতর্কিত বর্ণনাকারী। ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন রহ. বলেন, এর থেকে বহু অস্বীকৃত এবং প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা বর্ণিত রয়েছে।-আলকাশিফ ফি মা’রিফাতি মান লাহু রিওয়াইয়াতুন ফিল কুতুবিস সিত্তাহ ২/৫০
২. ইমাম ইবনে আদী রহ. তার থেকে কিছু হাদীস (এর মধ্যে আমাদের আলোচিত হাদীসটি অন্যতম) বর্ণনা করার পর বলেন, সবগুলোই গাইরে মাহফুজ। ( আর ইবনে আদী রহ. এর ভাষায় গায়রে মাহফুয শব্দটি মুনকার বা বাতিল বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।)-আলকামিল ফিযযুআফাইর রিজাল ৬/২৭৪
৩. ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন রহ. কে ঈসা ইবনে জারিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তার থেকে একমাত্র ইয়া’কুব আলকুম্মী ব্যতীত আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে আমার জনা নেই। وحديثه ليس بذاك তার হাদীস তেমন সুবিধাজনক নয়।-তারীখে ইবনে মায়ীন ২/১২১
৪. ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন রহ. বলেন, এর থেকে বহু অস্বীকৃত এবং প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা বর্ণিত রয়েছে।- তারীখে ইবনে মায়ীন ২/১২২
৫. ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন রহ. বলেন, এর থেকে বহু অস্বীকৃত এবং প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা বর্ণিত রয়েছে। ইমাম নাসায়ী রহ. বলেন, সে মুনকারুল হাদীস এবং তার থেকে মাতরুক (পরিত্যাজ্য) হাদীস বর্ণিত হয়েছে।-ইমাম যাহাবী, মিযানুল ই’তিদাল ৫/২৬৪
একমাত্র আবূ যুরআ রাযী এবং ইবনে হিব্বান রহ. ব্যতীত আর কেউ ঈসা ইবনে জারিয়া সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেননি। সবাই তার সম্পর্কে নেতিবাচক এবং বিরূপ মন্তব্য করেছেন। দু একজনের বিচ্ছিন্ন মতই কি গৃহীত হবে না সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গৃহীত হবে?
সহীহ ইবনে হিব্বানের মুহাক্কিক শুআইব আলআরনাউত রহ.ও হাদীসটির ব্যাপারে মন্তব্য করে বলেন, إسناده ضعيف। অর্থাৎ হাদীস সূত্রটি যয়ীফ। সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২৪০৯ (শামিলা সংস্করণ)

লেখকের বক্তব্য : ৫

লেখক মহোদয় তাঁর পুস্তিকার ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় আট রাকাআত তারাবীহ এর পক্ষে ৩ নম্বর হাদীসটি উল্লেখ করেন। হাদীসটির আরবী পাঠ নিম্নরূপ :
عن جابر بن عبدالله قال جاء أبي بن كعب إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال يارسول الله إنه كان مني الليلة شئ يعني في رمضان قال وماذاك يا أبي قال نسوة في داري قلن إنا لانقرأ القرآن فنصلي بصلاتك قال فصليت بهن ثمان ركعات وأوترت فكانت سنة الرضا ولم يقل شيئا
অর্থ : ‘জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, একদা উবাই বিন কা’ব রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! রমাযানের রাত্রে আমার পক্ষ থেকে একটি ঘটনা ঘটে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা কি হে উবাই? উবাই ইবনে কা’ব রাযি. বললেন, আমার বাড়িতে কিছু মহিলা এসেছিলো। তারা বললো আমরা কুরআন পাঠ করতে পারি না। তাই আমরা আপনার সাথে নামায আদায় করতে পারবো কি? ফলে আমি তাদের নিয়ে আট রাকাআত নামায আদায় করি এবং বিতর পড়ি। এটা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৌন সম্মতিমূলক সুন্নাত। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু বললেন না।’

হাদীসটি মু’জামে তাবারানী আউসাত, মুসনাদে আবূ ইয়ালা, মুসনাদে আহমদসহ বেশ কয়েকটি হাদীসগ্রন্থে রয়েছে। তবে মুসনাদে আহমদ এর মুহাক্কিক হামযা আহমদ যাইন হাদীসের সূত্রটিকে যয়ীফ বলে মন্তব্য করেছেন। আহমদ শাকের ও হামযা আহমদ যাইন টীকা কৃত মুসনাদে আহমদ ১৫/৪০৭/২০৯৯৭। তেমনিভাবে মুসনাদে আবূ ইয়ালা এর মুহাক্কিকও হাদীসটির সূত্রকে যয়ীফ বলে মন্তব্য করেছেন। মুসনাদে আবূ ইয়া’লা ৩/৩৩৬/১৮০১ (শামিলা সংস্করণ)

পর্যালোচনা

ক. হাদীসের মধ্যকার শব্দ বিশ্লেষণ :

سنة الرضا (সুন্নাতুর রিযা-মৌন সম্মতিমূলক সুন্নাত) না شبه الرضا (শিবহুর রিযা- মৌন সম্মতিসদৃশ সুন্নাত)?
হাদীসটিতে গ্রন্থের ভিন্নতায় ও গ্রন্থের কপির ভিন্নতায় সংশ্লিষ্ট শব্দটির মাঝে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। হাদীসটির মধ্যকার (سنة الرضا) ‘সুন্নাতুর রিযা’ শব্দটি শামিলা সংস্করণের মাজমাউয যাওয়ায়িদের তিনটি নুসখার (কপি) মধ্য হতে একটিমাত্র নুসখায় এবং শামিলার তুহফাতুল আহওয়াযী ও মুহাম্মদ ইবনে আলী নীমাভী রহ. এর আসারুস সুনানে ‘সুন্নাতুর রিযা’ শব্দটি এসেছে। কিন্তু মু’জামে তাবারানী আউসাত, মুসনাদে আবূ ইয়’লা, মুসনাদে আহমদ, মুহাম্মদ ইবনে নাসর মারওয়াযী রহ. এর কিয়ামুললাইল, শামিলা সংস্করণের মাজমাউয যাওয়য়িদ এর দু’টি নুসখাসহ সবগুলো হাদীস গ্রন্থে شبه الرضا (শিবহুর রিযা) শব্দ এসেছে। এক্ষেত্রে কিন্তু আমরা কাউকে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে চাই না। কিন্তু লেখক মহোদয়ের রুচিবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন অভিযোগ করার সুযোগ আছে কি না পাঠক বিবেচনা করবেন।

খ. নাম বিশ্লেষণ :

লেখক মহোদয় তার বইটির এগারো নাম্বার পৃষ্ঠার বার নাম্বার টীকায় লিখেছেন, ‘মুহাম্মদ ইবনু নাছর আল-মারূযী’। শব্দটি বস্তুত আল-মারূযী নয়; আল-মারূযী লেখা প্রচণ্ড রকমের ভুল। শব্দটি হলো আল-মারওয়াযী।-ইমাম সামআনী, আলআনসাব ৫/২৬৫

গ. সনদ বিশ্লেষণ :

লেখক তাঁর পুস্তিকার ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় বলেন, ইমাম হায়ছামী (রহঃ) বলেন, ‘হাদীছটির সনদ হাসান’। কিন্তু শাইখ আলবানী রহ. কিন্তু হাইসামী রহ. এর সব তাহকীকের উপর সন্তুষ্ট নন।

ঘ. অনুবাদগত অর্থ বিশ্লেষণ :

লেখক মহোদয় এগার নাম্বার পৃষ্ঠার ১৪ নাম্বার টীকায় শাইখ আলবানী রহ. এর وسنده يحتمل للتحسين عندى এ আরবী উক্তিটি উল্লেখ করেছেন। আর মূল গ্রন্থে এর অর্থ করেছেন, ‘আমার নিকট হাদীছটির সনদ হাসান হওয়ারই প্রমাণ বহন করে’। লেখক মহোদয় আরবী মন্তব্যটুকুর এ কি অর্থ করলেন? এখানে প্রমাণ বহন করার অর্থই বা কোথা থেকে এলো? এত গুরুত্বই বা কোত্থেকে এলো? বাক্যটির সরল অর্থ হবে, ‘আমার মতে হাদীসটির সনদ হাসান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ এমন আবশ্যিক এবং নিশ্চিত অর্থ তো আমরা বাক্যটি থেকে পাই না।

উপরন্তু এগুলো তো রিজাল শাস্ত্রের জরাহ তা’দীলের বাক্য। রিজাল শাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় এ জাতীয় বাক্য ব্যবহৃত হয়। এবার আমরা এ সংক্রান্ত রিজাল শাস্ত্রের কয়েকটি উক্তি উল্লেখ করব :

১. তেমনিভাবে যেসব হাদীস হুসন এবং যু’ফ এর সম্ভাবনা রাখে তাও যয়ীফ হাদীসের শ্রেণীভুক্ত। এজন্য আমরা কতক হাদীসবেত্তাকে দেখি, তারা অনেক ক্ষেত্রে কোনো হাদীসকে হাসান এবং যয়ীফ এর মধ্য হতে কোনো একটি বিশেষণে বিশেষিত করতে গিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তখন তাদের পরিভাষায় আমরা ব্যবহার হতে দেখি, حديث حسن إن شاء الله (আল্লাহ চাহে তো হাদীসটি হাসান হবে), حديث محتمل للتحسين (হাদীসটি হাসান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে), إسناده مقارب (হাদীসটির সনদ হাসান হওয়ার কাছাকাছি) এ জাতীয় দ্বিধাজনক বাক্যগুলো। এসব বাক্য মূলত হাদীসের ব্যাপারে সুনিশ্চিত হুকুম না হওয়ার প্রমাণ বহন করে। এর কারণ হলো বর্ণনাকারীর কতক গুণাবলী বা অন্য কোনো বিষয়ে রিজাল শাস্ত্রবিদদের সংশয় থেকে যায়।-ড. আব্দুল গনী বিন আহমদ, উসূলুত তাসহীহ ওয়াত তাযয়ীফ ১/৪
২. ‘শাইখ’ এবং ‘সালিহুল হাদীস’ শ্রেণীর রাবীদের হাদীসগুলো حديث محتمل للتحسين (হাদীসটি হাসান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে) এর শ্রেণীভুক্ত। ইবনে আবূ হাতেম রাযী রহ. যদিও শাইখ শব্দটিকে সালিহুল হাদীস থেকে শ্রেয় বলে অভিহিত করেছেন; কিন্তু তার পরবর্তী ব্যাখ্যা অনুসারে প্রমাণিত হয়, এধরনের বিশেষণে বিশেষিত হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না।Ñআব্দুল্লাহ বিন জুদাই’, তাহরীরু উলূমিল হাদীস ৩/১৭৩
৩. পূর্বতন কোন কোন হাদীস বিশেষজ্ঞ কোনো কোনো সনদের ক্ষেত্রে বলেন, هذا إسناد محتمل للتحسين । এর অর্থ এই নয় যে, এ সনদের হাদীসটি প্রমাণিত। বরং এ জাতীয় বাক্য জারাহ ভিত্তিক বাক্য هذا إسناد لين, ليس بالقوي, ليس بذلك এর পর্যায়ভুক্ত। আর এ শব্দগুলো যয়ীফ হাদীসের বৈশিষ্ট্যগত শব্দ।-প্রাগুক্ত

সুতরাং লেখক মহোদয়ের অনুবাদে হাদীস শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে চরম আপত্তি রয়েছে।
ঙ. ঈসা ইবনে জারিয়া সম্বন্ধে শাইখ আলবানী রহ. এর অবস্থান :
বস্তুত ঈসা ইবনে জারিয়া সম্বন্ধে শাইখ আলবানী রহ. এর দ্বিমুখী অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। নি¤েœ আমরা ঈসা ইবনে জারিয়া সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্যগুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।

১। এক জায়গায় তিনি ঈসা ইবনে জারিয়া থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের সূত্রকে সম্ভবনাময় হাসান সূত্র (إسناد محتمل للتحسين) বলে অভিহিত করেন। এরপর বলেন, ঈসা ইবনে জারিয়া হলো একজন বিতর্কিত রাবী। দু এক লাইন পরে গিয়ে ঈসা ইবনে জারিয়া বর্ণিত হাদীসটিকে সহীহ বলে ঘোষণা দেন। আসসিলসিলাতুস সাহীহা হাদীস ১৭৬০, (শামেলা)
২। অন্য একটি জায়গায় তিনি ঈসা ইবনে জারিয়া থেকে বর্ণিত হাদীসের সূত্রকে ‘পূর্ববর্ণিত হাদীসের কারণে হাসান’ (حسن بما قبله) বলে অভিহিত করেছেন। যখন তাঁর ব্যাপারে অভিযোগ করা হলো, তিনি ঈসা ইবনে জারিয়া এর বর্ণিত বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণ উপস্থাপন করেন তখন তিনি চটে গেলেন। এবং তিনি এ অভিযোগকে মিথ্যা অভিযোগ হিসেবে অভিহিত করলেন। দেখুন, তামামুল মিন্নাহ ফিত্তা’লীকি আলা ফিকহিস সুন্নাহ ১/২৬৮
৩। অন্যত্র তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেন, আমি নিরঙ্কুশভাবে ঈসা ইবনে জারিয়ার বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করিনি; বরং এ কথার দিকে ইঙ্গিত করেছি, তার বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না। রিসালাতু কিয়ামি রমাযান লিলআলবানী ১/৩
শাইখ আলবানী রহ. এর উপরোক্ত মন্তব্যগুলো দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল, তাঁর বক্তব্যে কিছুটা ধোঁয়াশা পরিলক্ষিত হলেও তিনি ঈসা ইবনে জারিয়াকে প্রমাণযোগ্য মনে করেন না।

চ. ইমাম যাহাবী রহ. এর মন্তব্যের বাস্তবতা :

লেখক মহোদয় তাঁর পুস্তিকার একই পৃষ্ঠায় হাদীসটি সম্বন্ধে মুবারকপুরী রহ. এর মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। মুবারকপুরী রহ. তাঁর ব্যাখ্যা গ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াযীতে যে আলোচনা করেছেন তার সারবক্তব্য হলো, আট রাকাআত সম্পর্কিত প্রথম হাদীসটি সম্বন্ধে ইমাম যাহাবী রহ. তার মীযানুল ই’তিদাল গ্রন্থে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন এবং ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হাদীসটি ফাতহুল বারীতে এনেছেন। আর ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীর ভূমিকায় স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি এ ব্যাখ্যা গ্রন্থে হাসান হাদীস থেকে নিচের পর্যায়ের কোনো হাদীস আনবেন না। তুহফাতুল আহওয়াযী ৩/৪৪২।

এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো, হাদীসটি সম্বন্ধে ইমাম যাহাবী রহ. এর মন্তব্য সম্বন্ধে কিছুটা নাতি দীর্ঘ আলোচনা আমরা পূর্বোক্ত হাদীসের আলোচনায় (লেখকের বক্তব্য ৩) করেছি। সেখানে আমরা দেখাতে চেষ্টা করেছি, ইমাম যাহাবী রহ. যে বাক্যে হাদীসটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন হাদীস শাস্ত্রে তার অবস্থান এবং ব্যাখ্যা কী। পাঠককে আলোচনাটি আরেকবার দেখে নিতে অনুরোধ করবো। দ্বিতীয়ত ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে যেসব হাদীস এনেছেন তার সব হাদীসই কি আপনারা বিনা বাক্যে গ্রহণ করেন? উত্তর ইতিবাচক নয়। এমন অসংখ্য হাদীস রয়েছে যেগুলোকে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে এনেছেন কিন্তু আপনারা সেগুলোকে যইফ বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং এখানে ফাতহুল বারীর প্রসঙ্গ টানা নিতান্তই আইওয়াশ। উপরন্তু ফাতহুল বারীতে যাকারিয়া আ. এর বৃক্ষ মাঝে আত্মগোপন করা এবং পরবর্তীতে করাত যোগে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু বরণ করা সংক্রান্ত অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাটিও এসেছে। সুতরাং ফাতহুল বারীকে সব বর্ণনার ক্ষেত্রে নিরাপদ জ্ঞান করা যায় না। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় এর বর্ণনাগুলোর উপর আস্থা স্থাপন করার অবকাশ রয়েছে।

ছ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র জীবন জুড়েই আট রাকাআত তারাবীহ পড়েছেন!

লেখক মহোদয় ১২ নাম্বার পৃষ্ঠায় আলবানী রহ. এর একটি উক্তি উল্লেখ করে আলোচনার একটা পরিসমাপ্তি টানতে চেয়েছেন। লেখক বলেন, যখন আমরা বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করি তখন আমাদের নিকট দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে এই সংখ্যার উপরই অব্যাহত ধারায় আমল করেছেন। এর অতিরিক্ত কিছু করেননি- তা রমাযান মাসে হোক বা তার বাইরে হোক।

আমরা বলি, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে এই সংখ্যার উপরই অব্যাহত ধারায় আমল করেছেন। এর অতিরিক্ত কিছু করেননি- তা রমাযান মাসে হোক বা তার বাইরে হোক’। এটি একটি অসার বক্তব্য। এর সপক্ষে সুপ্রমাণিত কোনো তথ্যসূত্র নেই। বরং আমরা বলবো, এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক আমল ছিল না। কারণ খোদ আম্মাজান আয়িশা রাযি. এর সূত্রেই তাহাজ্জুদের নামায ফজরের সুন্নাত ব্যতিরেকে তের রাকাআত হওয়া প্রমাণিত আছে। দেখুন সহীহ বুখারী হাদীস নং ১১৬৪; ফাতহুল বারী ৩/২৬; কিতাবুত তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১০।

অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাত্রের নামায ইশার দুই রাকাআত সুন্নাত ও বিতর ছাড়া কখনো কখনো সর্বমোট চৌদ্দ রাকাআত বা ষোল রাকাআত হতো; বরং কোনো বর্ণনামতে আঠারো রাকাআতও প্রমাণিত হয়। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/২১, হাদীস নাম্বার ৮৯৭; আত-তারাবীহু আকসারা মিন আলফি আম ফিল মাসজিদিন নাবাবী, আতিয়্যা মুহাম্মদ সালেম, সৌদি আরব ২১

অন্য এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لا توتروا بثلاث تشبهوا بصلاة المغرب و لكن أوتروا بخمس أو بسبع أو بتسع أو بإحدى عشرة ركعة أو أكثر من ذلك
অর্থ : তোমরা মাগরিবের নামাযের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিন রাকাআত বিতর পড়ো না। তবে তোমরা তাহাজ্জুদ ও বিতর পাঁচ রাকাআত পড়ো, সাত রাকাআত পড়ো, নয় রাকাআত পড়ো, এগারো রাকাআত পড়ো কিংবা তার চেয়ে বেশি পড়ো।- মুস্তাদরাকে হাকেম হাদীস ১১৩৭,

ইমাম যাইনুদ্দীন ইরাকী রহ. প্রমুখ বলেন, হাদীসটি সহীহ।- নাইলুল আউতার, শাউকানী ৩/৪৩, আত-তালখীসুল হাবীর, ইবনে হাজার আসকালানী ২/১৪
সর্বশেষ এ হাদীস সম্বন্ধে আমাদের মূল বক্তব্য হলো, এ হাদীসটি বর্ণনাসূত্রে সেই ঈসা ইবনে জারিয়া রয়েছেন। যার সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোচনা পূর্বোক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে করে এসেছি। সুতরাং এ হাদীসকে নিরেট প্রমাণযোগ্য মনে করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া আলবানী রহ. এর মন্তব্য ভাষা কিন্তু এ হাদীসের ক্ষেত্রে অনেকটা শিথিল হয়ে গেছে। অথচ পূর্বোক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে তার বক্তব্য ছিল সংশয়হীন স্পষ্ট। কিন্তু বর্ণনাকারী সেই ঈসা ইবনে জারিয়াই আছেন।

লেখকের বক্তব্য : ৬

সম্মানিত গ্রন্থকার তাঁর ছোট্ট গ্রন্থিকার ১৪ নাম্বার পৃষ্ঠায় সায়িব বিন ইয়াযিদ রাযি. সূত্রে আট রাকাআত তারাবীহ-এর সপক্ষে ৪র্থ নাম্বার হাদীসটি এনেছেন। হাদীসটির আরবী ভাষ্য নিম্নরূপ :
حَدَّثَنِي عَنْ مَالِك عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يُوسُفَ عَنْ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ أَنَّهُ قَالَ أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيمًا الدَّارِيّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً
অর্থ : সায়েব বিন ইয়াযীদ রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর রাযি. উবাই ইবনে কা’ব ও তামীম দারী রাযি. কে লোকদের নিয়ে ১১ রাকাআত নামায আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেন। (মুআত্তা মালিক; হা.নং ৩৭৯)

পর্যালোচনা

হাদীসটি সম্পর্কে আমাদের কোনো রকমের অনাগ্রহ নেই। থাকার প্রশ্নও আসে না। হাদীসটি সহীহ। যদিও ইবনে আব্দুল র্বার রহ. ১১ রাকাআতের বর্ণনাকে বর্ণনাকারীর বর্ণনাগত বি”্যুতি বলে অভিহিত করেছেন। এখন সমস্যা যেটা সেটা হলো স্বয়ং এ সায়িব বিন ইয়াযীদ রাযি. এবং আরো কয়েকজন তাবিয়ী সূত্রে বিশ রাকাআত তারাবীহ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সহীহ বর্ণনা রয়েছে। বিশ রাকাআত সংক্রান্ত সায়িব বিন ইয়াযীদ রাযি. এর হাদীসের বর্ণনা নিম্নরূপ :
وقد أخبرنا أبو عبد الله الحسين بن محمد بن الحسين بن فنجويه الدينوري بالدامغان ثنا أحمد بن محمد بن إسحاق السني أنبأ عبد الله بن محمد بن عبد العزيز البغوي ثنا علي بن الجعد أنبأ بن أبي ذئب عن يزيد بن خصيفة عن السائب بن يزيد قال كانوا يقومون على عهد عمر بن الخطاب رضي الله عنه في شهر رمضان بعشرين ركعة قال وكانوا يقرؤون بالمئين وكانوا يتوكؤن على عصيهم في عهد عثمان بن عفان رضي الله عنه من شده القيام
অর্থ : সায়িব বিন ইয়াযীদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর রাযি. এর যুগে লোকসকল রমাযান মাসে বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়তেন। তিনি আরো বলেন, তখন তারা শত আয়াত বিশিষ্ট কিরাত পাঠ করতেন। এবং উসমান রাযি. এর সময় কালে দাঁড়ানোটা কষ্টসাধ্য হয়ে যাওয়ার কারণে তারা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। সুনানে কুবরা বাইহাকী, হাদীস ৪৩৯৩

মুহতারাম লেখক এবং তাদের এ ধারার উলামায়ে কেরাম হয়তো এ দু’টি হাদীসের মাঝে সমন্বয়ের পথ গ্রহণ না করে প্রাধান্যের পথ বেছে নিবেন। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা, প্রাধান্যের পথে আগালে একটি বর্ণনার মাঝে যারপরনাই কসরত করে খুঁত বের করার আপ্রাণ সাধনা করতে হবে। আর তাঁরা স্বতঃসিদ্ধ সেই পথটিই বেছে নিয়েছেন। সায়িব বিন ইয়াযীদ রাযি. এর এগার রাকাআত সংক্রান্ত হাদীসটিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাঁরা বিশ রাকাআত সংক্রান্ত হাদীসটিতে খুঁত ধরতে চেষ্টা করেছেন। তাঁদের নিকট ধরা পড়া প্রথম খুঁতটি হলো, লেখক মহোদয়ের ভাষায় ‘ত্বাহক্বীক্ব: বর্ণনাটি জাল। এটি তিনটি দোষে দুষ্ট।

প্রথমত: এর সনদে আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুবী আদ-দায়নূরী নামক রাবী আছে। সে মুহাদ্দিছগণের নিকট অপরিচিত। রিজাল শাস্ত্রে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এজন্য শাইখ মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন,
لم أقف على ترجمته فمن يُدَّعِيْ صحة هذا الأثر فعليه اَنْ يَثْبُتَ كونَه ثقة قابلا للاحتجاج
‘আমি তার জীবনী সম্পর্কে অবগত হ’তে পারিনি। সুতরাং যে ব্যক্তি এই আছারের বিশুদ্ধতা দাবী করবে তার উপরে অপরিহার্য হবে নির্ভরযোগ্য হিসাবে দলীলের উপযুক্ততা প্রমাণ করা’। যার কোন পরিচয়ই নেই তার বর্ণনা কিভাবে গ্রহণীয় হতে পারে? মুহাদ্দিসগণের নিকটে এরূপ বর্ণনা জাল বলে পরিচিত।’ পৃষ্ঠা ২৮

লেখক মহোদয়ের অসঙ্গতি :

মূল আলোচনার পূর্বে মুহতারাম লেখকের উপরোক্ত বক্তব্যের কয়েকটি অসঙ্গতির দিকে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। অসঙ্গতিগুলো ছোট খাট অসঙ্গতি নয়। দীনী অনুপ্রেরণা থেকেই আমরা এ অসঙ্গতিগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছি। তাছাড়া মুহতারাম লেখক তার পুস্তিকার কিছু কিছু জায়গায় বেশ আপত্তিকর ভাষারীতি ব্যবহার করেছেন। এবং যেসব বিষয়কে উপজীব্য করে তিনি এমন আচরণ কর্মে ব্রতী হয়েছেন তা নিতান্তই একরৈখিক অধ্যয়নের কর্মফল; শাস্ত্রীয় বিবেচনায় যা আদৌ যথার্থ নয়। তাঁর ভাষারীতি দেখে মনে হয় না, তিনি শাস্ত্রীয় এবং আরবী বৈকারণিক এমন পদস্খলনের শিকার হতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সব ধরণের প্রান্তিকতা থেকে মুক্তি দান করুন।

অসঙ্গতি ১ :
লেখক আল্লামা মুবারকপুরী রহ. এর আরবী পাঠে হরকত তথা স্বরচিহ্ন ব্যবহার করেছেন। তন্মধ্য হতে দু’টি শব্দের স্বরচিহ্ন নিতান্তই প্রমাদপূর্ণ এবং ভ্রান্তিকর। প্রমাদপূর্ণ স্বরচিহ্নে আরবী পাঠটুকুর যে অর্থ হয় সে অর্থ কিন্তু লেখক তার বাংলা অনুবাদে করেননি। আমরা আরবী পাঠ সংশ্লিষ্ট শব্দ দু’টিকে প্রমাদপূর্ণ সে স্বরচিহ্নের মাধ্যমে আলাদা করে দিয়েছি। এখানে কি ধরণের প্রমাদ সৃষ্টি হয়েছে তা উদঘাটনের ভার আমরা সচেতন পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। পাঠক যদি আরবী ভাষা বিষয়ে অভিজ্ঞ হন তবে খুব সহজেই এর বৈকারণিক ভ্রান্তি আপনার সামনে ফুটে উঠবে। আর যদি অভিজ্ঞ না হন তবে বিনীত অনুরোধ করবো কোনো আরবী ভাষা বোদ্ধা থেকে এর ভ্রান্তি জেনে নিবেন। একটু অনুসন্ধিৎসু করে তুলতেই পাঠককে এ কষ্টটুকু দিলাম।

অসঙ্গতি ২ :
মুহতারাম লেখক সংশ্লিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেছেন আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুবী আদ-দায়নূরী। শব্দটা ফানজুবী নয়; ফানজুইয়াহ। ফানজুইয়াহ একটি নাম। এটা সম্বন্ধগত কোনো নাম নয় যে একে ফানজুবী বলার অবকাশ থাকবে। বরং এটি একটি স্বয়ংসম্পন্ন বিশেষ্য। ইবনে ফানজুইয়াহ ইতিহাস এবং রিজাল শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ একটি নাম। এ নামের ক্ষেত্রে এমন ভুল ব্যবহারে লেখকের যোগ্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমরা না হয় লেখকের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নাই তুললাম। কিন্তু আমাদের মতো এমন উদারচেতা মনোভাব কয়জন দেখাতে পারবে? এ তথ্য বিভ্রাটের জন্য কয়টি উদ্ধৃতি উল্লেখ করবো? আনুমানিক শতখানি গ্রন্থের উদ্ধৃতি পেশ করা যাবে। দু একটি উদ্ধৃতি গ্রন্থ উল্লেখ করছি। সুনানে বাইহাকী কুবরা ২/৪৯৩, ইমাম যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ৪৮/২৭৯, তাজুল আরুস ১/১৪৮৫

অসঙ্গতি ৩ :
লেখক সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারীর সম্বন্ধযুক্ত নামটি উল্লেখ করেছেন আদ-দায়নূরী। লেখক এখানে শব্দটির চরম একটি ভুল ব্যবহার করেছেন। বস্তুত শব্দটি আদ-দায়নূরী নয়; আদ-দাইনাওয়ারী। দাইনাওয়ার বর্তমান ইরানের হামাদান এবং কিরমানশাহ (কিরমিসীন) শহরের সন্নিকটস্থ একটি পাহাড় অধ্যুষিত শহর। এ শহরের সাথে সংযুক্ত হয়েই বর্ণনাকারীর সম্বন্ধযুক্ত নাম হয়েছে আদ-দাইনাওয়ারী। দেখুন, আসসাম‘আনী, আলআনসাব ২/৫৩১, মু’জামুল বুলদান ৯/৩৭৮

লেখক মহোদয়ের খুঁত আবিষ্কার : ১

এবার মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক। মূল আলোচনাটি ছিল সায়িব বিন ইয়াযীদ কর্তৃক বর্ণিত বিশ রাকাআত সম্পর্কিত হাদীসের ব্যাপারে লেখকের আপত্তি। লেখকের আপত্তির ভাষারীতিটা আরেকবার লক্ষ্য করুন। ‘ প্রথমত: এর সনদে আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুবী আদ-দায়নূরী নামক রাবী আছে। সে মুহাদ্দিছগণের নিকট অপরিচিত। রিজাল শাস্ত্রে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। যার কোন পরিচয়ই নেই তার বর্ণনা কিভাবে গ্রহণীয় হতে পারে? মুহাদ্দিসগণের নিকটে এরূপ বর্ণনা জাল বলে পরিচিত।’ পৃষ্ঠা ২৮
লেখক বলতে চাচ্ছেন, আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুইয়াহ মুহাদ্দিসগণের নিকট একজন অপরিচিত ব্যক্তি। লেখক মূলত উলূমুল হাদীসের পারিভাষিক শব্দ ‘মাজহুল’ এর আভিধানিক অর্থ করেছেন অপরিচিত বলে। এখন আমরা দেখতে চেষ্টা করবো, মাজহুল কাকে বলে? পারিভাষিক এ শব্দটি ইবনে ফানজুইয়াহ এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় কি না?

বাস্তবতা :

মাজহুল বিষয়ক বিশ্লেষণ :

মাজহুল তিন প্রকার। ১। মাজহুলুল আইন ২। মাজহুলুল হাল ৩। আলমাসতুর
১। মাজহুলুল আইন : মাজহুলুল আইন বলা হয়, এমন বর্ণনাকারীকে শিক্ষা দীক্ষায় যার কোনো প্রসিদ্ধি নেই এবং হাদীসবেত্তারাও তার শিক্ষা দীক্ষার ব্যাপারে কোনো পরিচয় তুলে ধরেননি এবং একজন মাত্র বর্ণনাকারী থেকেই তার হাদীস জ্ঞাত হয়েছে। মাজহুলুল আইন পর্যায়ের বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি মাজহুলুল আইন পর্যায়ের বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা রিজাল শাস্ত্রবিদ কর্তৃক সত্যায়িত হয় তবে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে। নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণের দু’টি পন্থা রয়েছে। ১. তার থেকে বর্ণনাকারী ব্যতীত অন্য কোনো বর্ণনাকারী তার নির্ভরযোগ্যতার সত্যায়ন করবে। ২. তার থেকে বর্ণনাকারী ব্যক্তিই তার নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে সত্যায়ন করবে। তবে শর্ত হলো এ সত্যায়নকারী ‘জারহ তা’দীল’ শাস্ত্রের ইমাম পর্যায়ের কেউ হবেন।

২। মাজহুলুল হাল : মাজহুলুল হাল এমন বর্ণনাকারীকে বলা হয় যার বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ ন্যায়পরায়ণতা গোচরীভূত নয়। এবং তার থেকে একাধিক বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনা করেছে; কিন্তু তাকে নির্ভরযোগ্য বলে কেউ ঘোষণা দেয়নি। মাজহুলুল হাল পর্যায়ের বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস বিশুদ্ধ মতানুসারে গ্রহণযোগ্য নয়।

৩। আলমাসতুর : আলমাসতুর এমন বর্ণনাকারীকে বলা হয় যার বাহ্যিক ন্যায়পরায়নতা পরিজ্ঞাত কিন্তু আভ্যন্তরীণ ন্যায়পরায়নতা গোচরীভূত নয়। এবং তার থেকে একাধিক বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনা করেছে; কিন্তু তাকে নির্ভরযোগ্য বলে কেউ ঘোষণা দেয়নি। আলমাসতুর পর্যায়ের বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস বিশুদ্ধ মতানুসারে গ্রহণযোগ্য নয়। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. অবশ্য মাজহুলকে দু ভাগে বিভক্ত করেছেন। তাউযীহুল আফকার মা’আ তানকীহিল আনযানর ২/১৯২, ফাতহুল মুগীস (মাজহুল বিষয়ক আলোচনা), নূরুদ্দীন ইতর, মানহাজুন নাকদ ফি উলূমিল হাদীস ১/৮৯, মাহমুদ তাহ্হান, তাইসীরু মুস্তালাহিল হাদীস ১/৬৫
মাজহুল বিষয়ক প্রাসঙ্গিক অনেক আলোচনা রয়েছে ‘মুস্তালাহুল হাদীস’ সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহে। তবে এখানে মাজহুল বিষয়ক মূল কথাগুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করা হয়েছে।

এখন আমরা মাজহুল বিষয়ক এ আলোচনার আলোকে বর্ণনাকারী ইবনে ফানজুইয়াহকে জাস্টিফাই করবো যে, মূলত এ বর্ণনাকারী মাজহুলের পর্যায়ভুক্ত হয় কি না?
এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা ইবনে ফানজুইয়াহ সম্পর্কে উলামায়ে মুহাদ্দিসীনের কিছু বক্তব্য তুলে ধরবো।
১। মুহাম্মদ আবূল মা‘আলী ইবনুল গাযী রহ. বলেন, ইবনে ফানজুইয়াহ এর প্রকৃত নাম হলো, আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন আদ-দাইনাওয়ারী। তিনি হাফিয, হুজ্জাহ এবং হাদীস শাস্ত্রের একজন ইমাম ছিলেন। তার হাদীস বিষয়ক বহু গ্রন্থ রয়েছে। ৪১৪ হিজরী সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। দিওয়ানুল ইসলাম ১/৮৭
২। বিখ্যাত আরবী অভিধানবিদ আল্লামা যাবিদী রহ. বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন আদ-দাইনাওয়ারী একজন হাফিয পর্যায়ের মুহাদ্দিস ছিলেন। তাঁর আলোচনা আলমাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ গ্রন্থের শুরুতে উল্লিখিত হয়েছে। আব্দুল গাফির আলফারিসী তারীখে নাইসাবুর গ্রন্থে তাঁর আলোচনা এনেছেন। এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন। ৪১৪ হিজরী সনে তাঁর ইন্তেকাল হয়। তাজুল আরুস ১/১৪৮৫
৩। হাফেয আবূ বাকার ইবনুন নুকতাহ আলহাম্বালী রহ. বলেন, ইসমাঈল বিন আব্দুর রাহমান ইবনে সাঈদ নাইসাবুরী রহ. আবূ আব্দুর রাহমান নাসাঈ রহ. এর আসসুনান আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ থেকে শ্রবণ করেছেন। আততাকয়ীদ লিমা’রিফাতি রুওয়াতিস সুনানি ওয়াল আসানীদ ১/১৬২
৫। হাফেয আবূ বাকার ইবনুন নুকতাহ আলহাম্বালী রহ. আরো বলেন, শিরওয়াইহ তারিখে হামাদানে উল্লেখ করেছেন, আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ থেকে তাঁর দুই ছেলে আবূল কাসিম সুফইয়ান এবং আবূ বাকার মুহাম্মদ, আবূল ফাতহ ইবনে আব্দুস, আবূল কাসিম মাক্কি ইবনে মুহাম্মদ ইবনে দাকীন আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি ‘সিকাহ’ এবং ‘সাদুক’ পর্যায়ের রাবী ছিলেন। অনেক ‘মুনকার’ রিওয়ায়াত তিনি বর্ণনা করতেন। তিনি সুন্দর হস্তাক্ষরের অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রচুর রচনাসম্ভার রেখে গেছেন। তাঁর থেকে প্রখ্যাত মুফাসসির আহমদ বিন মুহাম্মদ সা’লাবী হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি নাইসাবুরে ৪১৪ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। আততাকয়ীদ লিমা’রিফাতি রুওয়াতিস সুনানি ওয়াল আসানীদ ১/১৯০
ইবনে ফানজুইয়াহ এর ছেলে সুফইয়ান সম্বন্ধে আলাদা শিরোনাম তৈরি করে ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, সুফইয়ান ইবনুল হুসাইন ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুইয়াহ আসসাকাফী আলহামাদানী আবূলকাসিম। তিনি তাঁর পিতা আবূ আব্দুল্লাহ এবং আবূ উমর মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন আলবিসতামী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তারীখুল ইসলাম ৪৮/২৭৯
৬। হাফেয আবূ বাকার ইবনুন নুকতাহ আলহাম্বালী রহ. বলেন, হাফিয আবূল কাসিম আব্দুর রাহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে মান্দাহ রহ. হাফিয আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আততাকয়ীদ লিমা’রিফাতি রুওয়াতিস সুনানি ওয়াল আসানীদ ১/২৫৮
৯। আলী ইবনে আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আলমাদীনী আন নাইসাবুরী হাফিয আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আততাকয়ীদ লিমা’রিফাতি রুওয়াতিস সুনানি ওয়াল আসানীদ ১/৩১৩
১০। মুহাম্মদ বিন উসমান বিন আহমদ বিন জালাহ হাফিয আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী, তাবসীরুল মুনতাবিহ বিতাহরীরিল মুশতাবিহ ১/৪৩১
১১। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, হাফিয আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ সুনানে নাসাঈ আবূ বাকার ইবনুস সুন্নী থেকে শ্রবণ করেছেন। প্রাগুক্ত
১২। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, মুহাদ্দিস আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুইয়াহ আসসাকাফী আদদাইনাওয়ারী নাইসাবুরে ৪১৪ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। তাযকিরাতুল হুফফাজ ৩/৩৭১
১৩। আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুইয়াহ আসসাকাফী আদদাইনাওয়ারী থেকে যারা হাদীস বর্ণনা করেন তারা হলেন, ১. জা’ফার আবহারী ২. আব্দুর রাহমান ইবনে আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে মান্দাহ ৩. সা’দ বিন হামদ ৪. আবূল ফাযল আলকুমসানী ৫. আহমদ বিন আব্দুল্লাহ ৬. আবূ গালিব বিন কাসসার ৭. আবূল ফাতহ বিন আব্দূস ৮. আবূ নাসির আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সায়িদ ৯. আলী ইবনে আহমদ ইবনুল আখরাম ১০. আবূ সালিহ আল মুয়াজ্জিন ১১. মুহাম্মদ বিন ইয়াহইয়া আলমুযাক্কী ১২. মক্কী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে দুলাইর ১৩. আহমদ ইবনুল হুসাইন আলকরসী ১৪. ইমাম বাইহাকী ১৫. ইবনে ফানজুইয়ার ছেলে আবূ বাকার এবং ১৬. সুফইয়ান । আবূ আব্দুল্লাহ হামিদ বিন আহমদ, সুয়ূখুল বাইহাকী ফিস সুনানিল কুবরা ১/১৯
১৪। ইবনে মাকুলা রহ. বলেন, আবূ সা’দ সামআনী রহ. বলেছেন, আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ বিন আনবাহ হলেন, আদদাইনাওয়ার এলাকার অধিবাসী আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনে ফানজুইয়াহ আসসাকাফী। তিনি অনেক বড় হাফিয এবং বহু গ্রন্থ প্রণেতা। ইবনে মাকুলা, ইকমালুল কামাল ৬/১১৮
১৫। ইবনে মাকুলা রহ. বলেন, আব্দুর রহমান বিন গায’ বিন মুহাম্মদ আবূ মুসলিম আলআত্তার আননুহাওয়ান্দী আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে মাকুলা, ইকমালুল কামাল ৭/২০
১৬। আবূ বকর মুহাম্মদ বিন আব্দুল গনী আলবাগদাদী রহ. বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুইয়াহ আবূ বাকার ইবনুস সুন্নী রহ. থেকে নাসাঈ রহ. এর আসসুনান শ্রবণ করেছেন। তাকমিলাতুল ইকমাল ৪/৪৯৫
১৭। আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন বিন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুইয়াহ আবূ বাকার ইবনুস সুন্নী রহ. থেকে নাসাঈ রহ. এর আসসুনান শ্রবণ করেছেন। আর এ ইবনে ফানজুইয়াহ এর অনেক গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ৪১৪ হিজরী সনে রবীউল আউয়াল মাসে জুমআরর দিন রাতে ইন্তেকাল করেন। ইবনে নাসিরুদ্দীন আদদিমাশকী, তাউযীহুল মুশতাবিহ ৭/৬৪
১৮। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, ইবনে ফানজুইয়াহ হলেন আশশাইখুল ইমাম (শাইখ ইমাম), আলমুহাদ্দিসুল মুফীদ (উপকার এবং কল্যাণের আধার মুহাদ্দিস), বাকিয়াতুল মাশায়িখ (হাদীস বিশারদদের শেষ কৃতি) আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন ইবনে মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালিহ ইবনে শুআইব ইবনে ফানজুইয়াহ আস সাকাফী আদদাইনাওয়ারী। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন হারুন আল আত্তার, আবূ আলী ইবনে হাবশ, আবূ বাকার ইবনুস সুন্নী, আবূ বাকার আলকাতিয়ী, ঈসা ইবনে হামিদ আররুক্ষাজী, আবূল হুসাইন আহমদ বিন জা’ফর ইবনে হামাদান আদ দাইনাওয়ারী এবং হামাদান ও অন্যান্য শহরের অসংখ্য উলামায়ে কেরাম।
তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেন জা’ফর আলআবহারী, আব্দুর রাহমান ইবনে মান্দাহ, সা’দ বিন হামদ, তাঁর দুই ছেলে সুফইয়ান এবং মুহাম্মদ, আবূল ফাজল আল কুমসানী, আবূল ফাতহ আব্দূস ইবনে আব্দুল্লাহ, আহমদ বিন মুহাম্মদ ইবনে সায়ীদ, আলী ইবনে আহমদ ইবনে আখরাম আলমুয়াজ্জিন, আবূ সালিহ আহমদ বিন আব্দুল মালিক আলমুয়াজ্জিন, মুহাম্মদ বিন ইয়াহইয়া আলকিরমানীসহ অসংখ্য উলামায়ে কেরাম। শিরওয়াইহ তাঁর তারীখ গ্রন্থে বলেন ইবনে ফানজুইয়াহ ‘সিকাহ এবং সাদুক’ পর্যায়ের বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি ৪১৪ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১৭/৩৮৩
১৯। হিবাতুল্লাহ ইবনে আবিস সাহবা মুহাম্মদ ইবনে হায়দার আন নাইসাবুরী আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন ইবনে মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালিহ ইবনে শুআইব ইবনে ফানজুইয়াহ আস সাকাফী আদ-দাইনাওয়ারী থেকে সুনানে নাসাঈ শ্রবণ করেছেন। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১৮/৫৮৯
২০। হাফিয আহমদ বিন মুহাম্মদ ইবনে গালিব আবূ বাকার আলখাওয়ারিযামী থেকে আবূ আব্দুল্লাহ আলহুসাইন ইবনে মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালিহ ইবনে শুআইব ইবনে ফানজুইয়াহ আস সাকাফী আদ-দাইনাওয়ারী সুনানে নাসায়ী শ্রবণ করেছেন। ইবনুন নুকতাহ, আততাকয়ীদ লিমা’রিফাতি রুওয়াতিস সুনানি ওয়াল আসানীদ ১/১২৭

এখন পাঠক আপনিই বিবেচনা করুন ইবনে ফানজুইয়ার মত মহান হাদীসবেত্তা মাজহুল হতে পারেন কি না। মাজহুলের তিনটি প্রকারের কোনো একটি প্রকারও কি তাঁর ক্ষেত্রে ফিট করা সম্ভব? বস্তুত শাস্ত্রীয় বিবেচনায় তো মাজহুলের ‘মা’ও তাঁর ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না। ইবনে ফানজুইয়ার মত বর্ণনাকারীকে যারা মাজহুল বলেন তাদের অভিধা কি হতে পারে পাঠক এ ব্যাপারে আমাদেরকে সহায়তা করুন। লেখক মহোদয় যে বৃত্তের মাঝে পদচারণা করেন সে বৃত্তভুক্ত ভাইয়েরা আমাদের দিকে অন্ধ তাকলীদের তীর ছুড়ে মারেন। আমাদের সবিনয় প্রশ্ন হলো, মুবারকপুরী রহ. যখন একজন পরিচিত রাবীকে মাজহুল বললেন তখন মুহতারাম লেখকের কি ঘেটে দেখার প্রয়োজন ছিল না যে, আসলেই সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারী মাজহুল কি না? একটুখানি সচেতনতাবোধ দেখালে তো আর এত বড় পদস্খলন হতো না। আমরা অন্ধ তাকলীদে আক্রান্ত হলে মুহতারাম লেখকের এ তাকলীদকে আমরা কি নামে বিশেষণ করবো?

এবার দেখুন সালাফী ভাইদের গুরু পর্যায়ের ইমাম শাইখ আলবানী রহ. ইবনে ফানজুয়াহ রাযি. সম্বন্ধে কি বলেন। তিনি বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনে ফানজুইয়াহ সাকাফী একজন সিকাহ ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের রাবী। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা (১৭/৩৮৩) এবং শাযারাতুয যাহাব (৩/২০০) গ্রন্থদ্বয়ে তাঁর জীবনী আলোচিত হয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহা ওয়াল মাউযুআহ ১/১৮৫
শাইখ আলবানী রহ. এর মন্তব্যের আরবীপাঠ নিম্নরূপ :
وأبو عبد الله بن الحسين بن فنجويه الثقفي ثقة مترجم في “سير أعلام النبلاء” (১৭/৩৮৩) و”شذرات الذهب” (৩/২০০) سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة (১/১৮৫)

লেখক মহোদয়ের খুঁত আবিষ্কার ২

মুহতারাম লেখকের ভাষায় দ্বিতীয় খুঁতটি হলো ‘দ্বিতীয়ত: উক্ত বর্ণনায় ইয়াযীদ ইবনু খুছায়ফাহ নামে একজন মুনকার রাবী আছেন। সে ছহীহ হাদীছের বিরোধী হাদীছ বর্ণনাকারী। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এজন্য তাকে মুনকার বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী ও ইবনে হাজার আসক্বালানী তা সমর্থন করেছেন। তছাড়া সে যে মুনকার রাবী তার প্রমাণ হ’ল, সায়েব বিন ইয়াযীদ থেকে সে এখানে ২০ রাক’আতের কথা বর্ণনা করেছে। অথচ আমরা ৮ রাকাআতের আলোচনায় সায়েব ইবনু ইয়াযীদ থেকে মোট ৪টি হাদীস (৪-৭) উল্লেখ করেছি, যার সবগুলোই ছহীহ। সুতরা (লেখকই অনুস্বর দেননি) এই বর্ণনা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ পৃষ্ঠা ২৮-২৯

বাস্তবতা :

ক. এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম বক্তব্য হলো, ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ রাযি. একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী। আলআসরাম রহ. এর সূত্র মতে ইমাম আহমদ রহ., ইমাম আবূ হাতিম রাযী, ইমাম নাসায়ী এবং ইবনে সা’দ রহ. তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁর সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন রহ. বলেন ‘সিকাতুন হুজ্জাতুন’। ইমাম মালেক রহ.সহ সমস্ত ইমামগণ তদকর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেছেন। ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. তার ‘আসসিকাত গ্রন্থে তাঁর আলোচনা এনেছেন। হাফেয আবূলহাজ্জাজ মিযযী রচিত তাহযীবুল কামাল এবং হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রচিত তাহযীবুত তাহযীব এবং হাদয়ুসসারী গ্রন্থে ইয়াযীদ বিন খুসাইফা রাযি. সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আপনাদের মান্যবর ব্যক্তিত্ব আলবানী রহ. কে ইসমাঈল আনসারী রহ. অভিযোগ করেছিলেন, যে তিনি ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাকে যয়ীফ সাব্যস্ত করেছেন। আলবানী রহ. তার অভিযোগকে চরমভাবে প্রত্যাখান করে বলেছেন, আমি ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাকে যয়ীফ হিসেবে সাব্যস্ত করিনি; বরং আমি তাকে সিকা তথা গ্রহণযোগ্য বলেছি। দেখুন আলবানী রহ. এর বক্তব্য ‘দ্বিতীয়ত তিনি আমার ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন, আমি উমর রাযি. থেকে বিশ রাকাআত তারাবীহ বর্ণনাকারী ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাকে যয়ীফ হিসেবে সাব্যস্ত করেছি। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তিনি তার পুস্তিকার কয়েক পৃষ্ঠা কালো করেছেন। যাতে তিনি আয়িম্মায়ে কেরামের উক্তির সমর্থনে আমাকে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, উক্ত বর্ণনাকারী হলো সিকা তথা গ্রহণযোগ্য। অথচ তিনি জানেন, এক্ষেত্রে আমি তাদের বিরোধী নই। আমি আমার পুস্তকে ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ ইবনে উমর (শামিলা সংস্করণে এভাবেই লেখা) থেকে তারাবীহ এর যে রাকাআত সংখ্যা বর্ণনা করেছেন তার দুর্বলতার বিভিন্ন দিক বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছি, ইবনে খুসাইফাহ যদিও সিকা তথা নির্ভরযোগ্য কিন্তু ইমাম আহমদ এক বর্ণনা মতে তার ব্যাপারে বলেছেন মুনকারুল হাদীস। এরপর আমি সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারী সম্বন্ধে আমার সম্পূর্ণ বক্তব্যে সে যে আমার নিকট নির্ভরযোগ্য সে বিষয়টি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছি। সুতরাং সেগুলো বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। আমার উপর শাইখের মিথ্যারোপের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কেউ ইচ্ছে করলে আমার আলোচনাগুলো দেখে নিতে পারে।’-তামামুল মিন্নাহ ফিত তা‘লীকি আলা ফিকহিস সুন্নাহ ১/২৫৩

খ. মুহতারাম লেখক বলেছেন ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এ জন্য তাকে মুনকার বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী ও ইবনে হাজার আসকালানী তা সমর্থন করেছেন।’

আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা সম্পর্কে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর দু’টি অভিমত রয়েছে। একটি আসরাম রহ. কর্তৃক বর্ণিত অভিমত। এতে বলা হয়েছে তিনি ‘সিকাহ’ ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনা হলো আর্জুরী রহ. কর্তৃক ইমাম আবূ দাউদ রহ. সূত্রে বর্ণিত অভিমত। সেখানে বলা হয়েছে তিনি মুনকারুল হাদীস ছিলেন। এ দু’টি বর্ণনাই ন্যায়সঙ্গতভাবে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তার তাহযীবুত্তাহযীব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তো এতে ইমাম আহমদ রহ. এর মুনকারুল হাদীস উক্তির উপর ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর সমর্থন কিভাবে প্রমাণিত হলো? দু’টি অভিমতের মধ্য হতে যে কোনো একটির উপর ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর সমর্থন প্রমাণের জন্য তো তাঁর আলাদা বক্তব্যের প্রয়োজন। মুনকারুল হাদীস অভিমতের সপক্ষে তো তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। লেখক মহোদয় ‘প্রতারণা’ শব্দটি খুব বেশি ব্যবহার করেন। আমাদের এ সংশ্লিষ্ট আলোচনার ক্ষেত্রে কি ঐ শব্দটির ব্যবহার হতে পারে? লেখক মহোদয়ের বৃত্তভুক্ত ভাইদের কাছে আমাদের বিনীত প্রশ্ন এটি। ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা রাযি. সম্বন্ধে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. সর্বশেষ যে উক্তিটি পেশ করেছেন তা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। সুবিধার্থে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর সে নিজস্ব উক্তিটির আরবী পাঠ তুলে দিচ্ছি।
قلت: زعم ابن عبد البر انه ابن أخي السائب بن يزيد وكان ثقة مأمونا
অর্থ : আমি বলি, ইবনে আব্দুল র্বার রহ. দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা হলো সায়িব বিন ইয়াযীদ রাযি. এর ভ্রাতুষ্পুত্র। তিনি সিকাহ এবং মামূন পর্যায়ের রাবী ছিলেন। তাহযীবুত তাহযীব ৫/৪৮৬
বিষয়টি পরিষ্কার করার উদ্দেশে আরবী পারদর্শী পাঠকদের জন্য ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ সম্পর্কে জরাহ তা’দীল বিষয়ক ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর পূর্ণ বক্তব্যটি তুলে দিচ্ছি।
قال الاثرم عن أحمد وأبو حاتم والنسائي ثقة وقال الآجري عن أبي داود قال أحمد منكر الحديث وقال ابن أبي مريم عن ابن معين ثقة حجة وقال ابن سعد كان عابدا ناسكا كثير الحديث
ثبتا وذكره ابن حبان في الثقات. قلت: زعم ابن عبد البر انه ابن أخي السائب بن يزيد وكان ثقة مأمونا
تهذيب التهذيب لأحمد العسقلاني – (৫ / ৪৮৬

এবার হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ সম্পর্কিত ইমাম আহমদ রহ. এর মুনকারুল হাদীস অভিমত সম্বন্ধে কি বলেন শুনুন। ‘ইয়াযীদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খুসাইফা আলকিন্দী। কখনো তাঁর পিতামহ এর সাথে সম্পৃক্ত করে ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাও বলা হয়। ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন রহ. বলেন, তিনি ‘সিকাতুন হুজ্জাতুন’। আলআসরাম রহ. এর সূত্র মতে ইমাম আহমদ তেমনিভাবে ইমাম আবূ হাতিম রাযী, ইমাম নাসাঈ এবং ইবনে সা’দ রহ. তাঁকে ‘তাউসীক’ করেছেন। আবূ উবাইদ আলআজুররী রহ. ইমাম আবূ দাউদ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ইমাম আহমদ রহ. বলেছেন, ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা ‘মুনকারুল হাদীস’। আমি বলি, ইমাম আহমদ রহ. এ শব্দটি এমন বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন যে তার সমসায়িকদের কাছে দুর্লভ হাদীস বর্ণনা করেন। ইমাম মালেক রহ.সহ সমস্ত ইমামগণ ইবনে খুসাইফা কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল উপস্থাপন করেছেন। হাদয়ুস সারী মুকাদ্দামাতু ফাতহিল বারী ২/৩৯৪

হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর উপরোক্ত বক্তব্যের আলোকে প্রমাণিত হলো, ইমাম আহমদ রহ. এর মুনকারুল হাদীস শব্দ প্রয়োগ করা দ্বারা বর্ণনাকারীর বর্ণনায় খুঁত ধরা উদ্দেশ্য নয়। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তিনি তার সমসাময়িক বর্ণনাকারীদের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তিনি এককভাবে এমন কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন যা তার সমসাময়িক বর্ণনাকারীগণ বর্ণনা করেননি। ইমাম যাহাবী রহ. মিযানুল ই’তিদালে আলী ইবনুল মাদিনী এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, সিকাহ এবং হাফিয পর্যায়ের বর্ণনাকারী যখন এককভাবে হাদীস বর্ণনা করেন তখন সেটা তার উচ্চতর এবং পূর্ণতর মর্যাদার বার্তা বহন করে। সাথে সাথে হাদীসবেত্তাদের গোচরীভূত নিগূঢ় কিছু কারণে হাদীস শাস্ত্রের জ্ঞানগভীরতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সমসাময়িকদের তুলনায় বেশি মনোযোগের প্রমাণ বহন করে। তবে তাতে যদি কোনো বিভ্রান্তি বা বিচ্যুতি দৃষ্টিগোচর হয় তবে সেটা সবার সামনে চলে আসবে। এরপর যাহাবী রহ. আরো বলেন, নবীন প্রবীণ সাহাবায়ে কেরামের প্রথম দিককার অবস্থার দিকে লক্ষ্য করুন। সেকালে প্রত্যেকেই এককভাবে এমন সুন্নাহ জানতেন যা অন্য কেউ জানত না। তবে কি বলা হবে যে, এ হাদীসটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা তার অনুরূপ অন্য কোনো হাদীস নেই। তেমনিভাবে তাবিয়দের যুগে তাদের প্রত্যেকের কাছে এমন অনেক হাদীসের ইলম ছিল যা অন্যের কাছে ছিল না। মিযানুল ই’তিদাল ২/৯৭

ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর উপরোক্ত বক্তব্য জানার পরও কি এ কথা বলার সুযোগ আছে যে, ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা সম্পর্কিত ইমাম আহমদ রহ. এর নেতিবাচক বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন?
গ.লেখক মহোদয় বলেছেন, ইমাম যাহাবী রহ. নাকি ইমাম আহমদ রহ. এর নেতিবাচক উক্তিকে সমর্থন করেছেন।
এ ব্যাপারে আমরা কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করবো।

১। এ সমর্থনটা কি প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ? লেখক মহোদয় হয়তো বলবেন পরোক্ষ। কারণ ইমাম যাহাবী রহ. মিযানুল ই’তিদালে ইমামদের উক্তি উল্লেখ করার পর নিজস্ব কোনো বক্তব্য উল্লেখ করেননি। এখন আমাদের প্রশ্ন হলো এ পরোক্ষ সমর্থনের নিদর্শনটা কি? কি উপায়ে উপলব্ধ হলো যে, ইমাম যাহাবী রহ. নেতিবাচক উক্তিটিকে সমর্থন করেছেন। তাহলে কি বলবেন নীরবতা সম্মতির লক্ষণ? এখানে এ নীতিবাক্য প্রয়োগের কোনোই সুযোগ নেই। কারণ ইমাম যাহাবী রহ. মিযানুল ই’তিদালে প্রথমে ইমাম আহমদ, আবূ হাতিম রাযী, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন এবং নাসাঈ রহ. এর তাওসীক উল্লেখ করেছেন। তো তিনি ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। আর ‘জরহ এবং তা’দীলের বিরোধ হলে জরহ প্রাধান্য পাবে’ বলে যে নীতির প্রসিদ্ধি রয়েছে তা সর্বাত্মক কোনো নীতি নয়। এ নীতির জন্য আলাদা স্থান কাল রয়েছে। নতুবা কোনো রাবীকেই সিকাহ বলার সুযোগ থাকবে না। কারণ এমন কোনো বর্ণনাকারী পাওয়া দুষ্কর হবে যার পক্ষে বিপক্ষে ইতিবাচক নেতিবাচক কোনো উক্তি নেই। আর ‘সবশেষে যে উক্তি উল্লেখ করবেন সেটাই তার মত বা সমর্থনের প্রমাণ’ একথা বলারও কোনো সুযোগ নেই। কারণ একথা প্রমাণের জন্য ইমাম যাহাবী রহ. এর নিজস্ব বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে।

২। ইমাম যাহাবী রহ. মিযানুল ই’তিদাল ফি জুআফাইর রিজাল গ্রন্থে ইয়াযীদ বিন খুসাইফাকে এনেছেন বলেই তাকে পরিত্যাজ্য বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ মিযানুল ই’তিদালে স্থান পাওয়াটাই তার দুর্বলতার প্রমাণ বহন করে না। এবার এ ব্যাপারে স্বয়ং মিযানুল ই’তিদালের গ্রন্থকার ইমাম যাহাবী রহ. বক্তব্য শুনুন। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, মিযানুল ই’তিদালের মৌলিক আলোচ্য বিষয় যয়ীফ রাবীদের সম্পর্কে আলোচনা। এ গ্রন্থে অনেক সিকাহ রাবীদের আলোচনা এসেছে। তাদের প্রতিরক্ষার জন্য আমি তাদের আলোচনা এখানে এনেছি। অথবা এ কারণে তাদের আলোচনা এখানে এনেছি যে, তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক আলোচনা তাদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করে না। মিযানুল ই’তিদাল ৪/৬১৬

যাহাবী রহ. আরো বলেন, এ গ্রন্থে এমন কিছু রাবীর আলোচনা এসেছে যারা সিকাহ এবং মহান হওয়া সত্ত্বেও সামান্য শিথিলতা এবং সামান্য জরহের কারণে তাদেরকে কিতর্কিত করা হয়েছে। যদি ইবনে আদী এবং অন্যান্য জারহ তা’দীলের ইমামগণ এ ধরনের রাবীদেরকে উল্লেখ না করতেন তাহলে আমি সিকাহ হওয়ার কারণে তাদের নাম উল্লেখ করতাম না। উপরোক্ত আয়িম্মায়ে কেরামের রিজাল গ্রন্থে যাদেরকে সামান্য শিথিলতার কারণে বিতর্কিত করা হয়েছে তাদের নাম আমি অনুল্লেখ করাকে যুথোপযুক্ত মনে করিনি। কারণ এতে করে আমি সমালোচিত হওয়ার শঙ্কাবোধ করছি। আমার নিকট যয়ীফ বা দুর্বল পর্যায়ের রাবী হওয়ার কারণে আমি তাদের নাম উল্লেখ করেছি-ব্যাপারটি এরকম নয়। তবে বুখারী, ইবনে আদীসহ অন্যান্য রিজালবিদদের গ্রন্থে যেসব সাহাবায়ে কেরামের নাম এসেছে তাদের মহত্বের কারণে তাদের নাম আমি এ গ্রন্থে উল্লেখ করিনি। কারণ হাদীসে দুর্বলতা বা সমস্যা সৃষ্টি হয় সাহাবীদের নিচের বর্ণনাকারীদের কারণে; সাহাবীদের কারণে নয়। তেমনিভাবে আমি আমার এ গ্রন্থে দীনের শাখাগত বিষয়ে অনুসৃত ইমামদের মধ্য হতে কারো নাম উল্লেখ করবো না। কারণ ইসলামে তাদের মর্যাদা এবং মানুষের হৃদয়ে তাদের বড়ত্ব অনেক বেশি। যেমন আবূ হানীফা, শাফেয়ী এবং বুখারী রহ.। যদি এদের মধ্য হতে কারো নাম উল্লেখ করি তবে ন্যায়সঙ্গতভাবেই উল্লেখ করবো। এটা তাকে আল্লাহ এবং মানুষের নিকট হেয়প্রতিপন্ন করবে না। বরং মিথ্যা বলা, অধিক ভ্রান্তিতে অবিচল থাকা এবং অব্যাহতভাবে সত্য মিথ্যাকে লেজেগোবরে করে ফেলা ইত্যকার বিষয় মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ এগুলো হলো বিশ্বাসঘাতকতা এবং মহা অপরাধ। একজন মুসলিম ব্যক্তি স্বভাবগতভাবে সব কিছুই করতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা এবং মিথ্যায় লিপ্ত হতে পারে না। মিযানুল ই’তিদাল ১/২

তাই তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইমাম যাহাবী রহ. সিকাহ পর্যায়ের রাবী জা’ফার ইবনে ইয়াস আলওয়াসিতী এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ইবনে আদী রহ. তাঁর আলকামিল গ্রন্থে এ রাবীর আলোচনা এনেছেন। এতে করে ইবনে আদী খুব খারাপ কাজ করেছেন। হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান এর জীবন বৃত্তান্তে বলেন, ইবনে আদী যদি একে তার আলকামিল গ্রন্থে উল্লেখ না করতেন তবে আমি তার জীবনী এখানে উল্লেখ করতাম না। সাবিত আলবুনানী এর জীবনীতে বলেন, সাবিত তার নামের মতই একজন সাবিত (প্রতিষ্ঠিত) রাবী। ইবনে আদী তার নাম উল্লেখ না করলে আমি উল্লেখ করতাম না। হুমাইদ বিন হিলালের মত মহান রাবীর সম্পর্কে বলেন, ইবনে আদী এর আলকামিলে তার আলোচনা এসেছে। এ জন্যই আমি তার নাম উল্লেখ করেছি। নতুবা এতো একজন হুজ্জাহ পর্যায়ের রাবী। উয়াইস আলকারানী এর জীবনী আলোচনায় বলেন, যদি বুখারী উয়াইস আলকারানীকে যয়ীফদের শ্রেণীভুক্ত না করতেন তবে আমি তার নাম মোটেও উল্লেখ করতাম না। কারণ তিনি তো আল্লাহর সৎকর্মশীল ওয়ালীদের মধ্যে অন্যতম। খ্যাতিমান ইলমে হাদীসের হাফিয আব্দুর রাহমান ইবনে আবূ হাতিম এর জীবনী আলোচনায় বলেন, আমি তার নাম উল্লেখ করতাম না যদি আবূল ফাজল আসসুলাইমানী তার নাম উল্লেখ না করতেন। তার নাম উল্লেখ করে তিনি কতই না নিকৃষ্ট কাজ করেছেন!

ইমাম যাহাবী রহ. এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির ভূমিকাতে তিনি বলেন, ‘আমি আমার আলমিযান গ্রন্থে বিশাল সংখ্যক সিকাহ রাবীদের জীবন বৃত্তান্ত উল্লেখ করেছি যাদের বর্ণিত হাদীস দ্বারা ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসের ইমামগণ প্রমাণ পেশ করেছেন। কারণ তাদের মধ্যে অনেকের নাম জরহ বিষয়ক গ্রন্থাদিতে সংকলিত হয়েছে। আমার নিকট তাদের মাঝে দুর্বলতা থাকার কারণে তাদের নাম আমি আলোচনা করিনি; বরং আমি তাদের নাম এনেছি তাদের মূল পরিচিতিটা তুলে ধরার জন্য। আমার সামনে এমন অনেক সিকাহ এবং হাদীসের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির নাম এসেছে যাদের ব্যাপারে তীর্যক আলোচনা হয়েছে যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।’ এরপর তিনি এমন অনেক রাবীদের নাম উল্লেখ করেন যাদের ব্যাপারে সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু সে সমালোচনা তাদের উপর কোনো ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না।

ইসমাঈল বিন মুহাম্মদ আলআনসারী, তাসহীহু হাদীসি সালাতিত তারাবীহ ইশরীনা রাকআতান ওয়ার রাদ্দু আলাল আলবানী ফি তাযঈফিহী ১৪-১৫, শাইখ আব্দুল মুহসিন আলইবাদ, আলইমাম আলবুখারী ওয়া কিতাবুহু আলজামিউস সাহীহ ১/২২

এবার ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রহ. এর নিজস্ব বক্তব্য লক্ষ্য করুন। ‘ইয়াযীদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খুসাইফাহ [কুতুবে সিত্তার (হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয়টি গ্রন্থ) প্রতিটিতে তাঁর থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।]। খুসাইফাহ হলো সায়িব ইবনে ইয়াযীদ ইবনে সাঈদ ইবনে উখতে নামার আলকিন্দী এর ভাই। সুতরাং তিনি হলেন সায়িব ইবনে ইয়াযীদ রাযি. এর ভ্রাতুষ্পুত্রের ছেলে। তিনি মদীনার অধিবাসী একজন বিশিষ্ট ফকীহ ছিলেন। তিনি সায়িব ইবনে ইয়াযীদ, উরওয়া ইবনুয যুবাইর, বাশার বিন সাঈদ, ইয়াযীদ ইবনে কুসাইত রাযি. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এবং ইমাম মালেক, সুফইয়ান সাওরী, সুলাইমান ইবনে বিলাল, ইসমাঈল ইবনে জা’ফার, সুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ এবং দারাওয়ারদীসহ অন্যান্য বিশিষ্ট উলামায়ে কেরাম তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. তাঁকে নির্ভরযোগ্য রাবী বলে অভিহিত করেছেন। ইবনে সা’দ রহ. বলেন, তিনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত সার্বক্ষণিক ইবাদত উপাসনাায় মনোযোগী, বিপুল পরিমাণ হাদীসের ধারক ব্যক্তি। আমি বলি, তিনি একশত ত্রিশ হিজরী সনের পরবর্তী সময়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।’ সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৬/১৫৭, তারীখুল ইসলাম ১৪/১৬৭

এখনো কি একথা বলা যাবে, ইমাম যাহাবী রহ. ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ এর মুনকারুল হাদীস হওয়ার ব্যাপারটিকে সমর্থন করেছেন?
৩। ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ রহ. যদি ‘মুনকারুল হাদীস’ এর সরল অর্থের বিবেচনায় একজন অগ্রহণযোগ্য এবং বিতর্কিত রাবী হয়ে থাকেন তাহলে সহীহ বুখারীকে আর সহীহ বুখারী বলার সুযোগ থাকছে না। কারণ আমাদের ঝটিকা জরিপ অনুযায়ী সহীহ বুখারীর ছয়টি হাদীস রয়েছে যা ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ থেকে বর্ণিত। তাহলে এখন শাইখ আলবানী রহ. এর মতো দায়িত্ব সচেতন (?) কোনো হাদীসের অনুসারী ব্যক্তি সহীহ বুখারীকে ডিভাইড করে সহীহুল বুখারী এবং যয়ীফুল বুখারী বানিয়ে দিলে বোধ হয় উম্মাহ বেশ উপকৃত হবে! এ ধারার উলামায়ে কেরামের প্রান্তিক এবং একরোখা বাচনভঙ্গি ও অধ্যয়ন দেখলে আমাদের প্রবল আশঙ্কা হয়, তারা অচিরেই ইমাম দারাকুতনী রহ. এর অনুসারী হয়ে সহীহ বুখারীকে ডিভাইড করে ফেলবেন। এবার সনদসহ ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাহ বর্ণিত সহীহ বুখারীর হাদীসগুলো একবার দেখে আসুন। এখানে শুধু হাদীস নাম্বারগুলো প্রদান করা হলো। ৪৭০, ১০৭২, ২৩২৩, ৩৩২৫, ৬২৪৫, ৬৭৭৯।

লেখক মহোদয়ের খুঁত আবিষ্কার : ৩

মুহতারাম লেখক সংশ্লিষ্ট বিশ রাকআত তারাবীহ এর বর্ণনার তৃতীয় দোষ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, ‘তৃতীয়ত: এটি কখনো ‘মুযত্বরাব’ পর্যায়ের। এই বর্ণনায় বিশ রাকাআতের বর্ণনা এসেছে। কিন্তু অন্য বর্ণনায় আবার ২১ রাকাআতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই শাইখ আলবানী বলেন, এটি ‘মুযত্বারাব’ পর্যায়ের হওয়ায় পরিত্যাজ্য।’

বাস্তবতা :

ক. মুহতারাম লেখক বললেন, ‘মুযত্বারাব’। মুযতারাব বস্তুটি মূলত কি? আরবী ভাষায় কিংবা হাদীস শাস্ত্রে অথবা অন্য কোনো শাস্ত্রে মুযতারাব বলে কোনো শব্দ আছে বলে আমার জানা নেই। বলতে পারেন এটা আমার অজ্ঞতা। আমি যতটুকু জানি তা হলো, মুযতারাব (আরবী المضطرب) এর মূল ক্রিয়া হলো, আল-ইযতিরাব (الاضطراب)। আর আরবী ভাষার এ ক্রিয়াটি الفعل اللازم তথা অকর্মক ক্রিয়া। আর আরবী ভাষার স্বতঃসিদ্ধ একটি নীতি হলো, অকর্মক ক্রিয়া থেকে কখনো الفعل المجهول তথা কর্মবাচ্যমূলক ক্রিয়া ও الاسم المفعول তথা কর্মবাচ্য বিশেষ্য গঠিত হয় না। আর হাদীস শাস্ত্রে পারিভাষিক যে শব্দটি আছে তা হলো, আলহাদীসুল মুযতারিব। মদীনা ইউনিভার্সিটিতে লেখা পড়া করা মানুষেরও এমন ভুল হতে পারে! এরূপ ভ্রম আমাদের হলে না কিছুটা প্রবোধ দেয়া যায়!

খ. ‘এটি কখনো ‘মুযত্বরাব’ পর্যায়ের।’ এটা কেমন কথা। মুহতারাম লেখক এ কি কথা বললেন? এ কথার অর্থ কি? এও কি সম্ভব যে একটি হাদীস নির্দিষ্ট একটা সময়ে মুযতারিব হবে অন্য সময় মুযতারিব হবে না? কখনো মানে কি? কখনো মানে কোনো এক সময়। সবসময় নয়। তাহলে কি কাল বিবেচনায় হাদীসের মান নির্ণিত হয়। এক সময়ে যয়ীফ তো অন্য সময় সহীহ। একজন প্রাথমিক ছাত্রেরও তো এ কথাটি মানতে বেশ কষ্টকর হয়ে যাবে। না কি ব্যক্তি বিবেচনায় হাদীসের মান নির্ণিত হয়। আপনাদের কাছে হাদীসটি মুযতারিব আর আমাদের কাছে সহীহ। এ ব্যাখ্যা হলে এতো ‘দীনী রেষারেষি’ কেন? আমাদেরটা তো মেনেই নিলেন। ব্যস, নববী পন্থা গ্রহণ করে নীরব থাকলেই তো হতো!

মুযতারিব হাদীস বিষয়ক আলোচনা :

বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতায় এখানে আমরা হাদীসে মুযতারিব সম্বন্ধে দু একটি কথা জেনে রাখতে চাই।
আল-মুযতারিব (المضطرب) শব্দটি আলইযতিরাব (الاضطراب) মূল ক্রিয়া থেকে গঠিত কর্তাবিশেষ্য পদ। আলইযতিরাব শব্দটির মূল অর্থ হলো, ঢেউ খেলা, সমুদ্র তরঙ্গায়িত হওয়া, উত্তাল হওয়া। যখন সমুদ্র ঢেউ ফুসে উঠে এবং ঢেউয়ের উপর ঢেউ আছড়ে পড়ে তখন আরবী ভাষায় বলা হয় اضطرب الموج। অর্থাৎ সমুদ্রের ঢেউ ভীষণভাবে তরঙ্গায়িত হয়েছে। আভিধানিক অর্থে কোনো বিষয়ে মতভিন্নতা সৃষ্টি হওয়া, ব্যবস্থাপনা ভণ্ডুল হওয়া ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হয়।

পারিভাষিক অর্থে হাদীসে মুযতারিব বলা হয়, শক্তি ও দৃঢ়তার দিক দিয়ে সমমানের একাধিক সূত্রে বর্ণিত বিরোধপূর্ণ হাদীস কিংবা ভিন্ন ভিন্ন সূত্রধারায় বর্ণিত সমান দৃঢ়তাসম্পন্ন বিরোধপূর্ণ হাদীস। অর্থাৎ যেসব হাদীস পরস্পর বিরোধপূর্ণ শব্দে বর্ণিত হয়েছে যেগুলোর মাঝে আদৌ সমন্বয় সম্ভব নয় এবং যে বর্ণনাগুলো সর্ব দিক দিয়ে সমান দৃঢ়তাসম্পন্ন সেসব হাদীসকে হাদীসে মুযতারিব বলা হয়।
হাদীস মুযতারিব হওয়ার জন্য দু’টি শর্তের উপস্থিতি আবশ্যক। ১. হাদীসের বর্ণনাগুলো এমন বিরোধপূর্ণ হওয়া যে এগুলোর মাঝে আদৌ সমন্বয় সম্ভব নয়। ২. বর্ণনাগুলো এমন সমান শক্তিসম্পন্ন হওয়া যে একটিকে অন্যটির উপর প্রাধান্য দেয়া সম্ভব নয়। আবূ সানাদ মুহাম্মদ, মাউসুআতু হাল ইয়াসতাউইললাযীনা…১/২৯

প্রশ্ন হলো, আমাদের আলোচিত হাদীসটিতে কি মুযতারিব হওয়ার দু’টি শর্তের কোনো একটি পাওয়া যাচ্ছে? সংশ্লিষ্ট হাদীসে শব্দের যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে সে ভিন্নতার মাঝে কি সমন্বয় অসম্ভব?
ইযতিরাব সাধারণত সনদের মাঝে হয়ে থাকে। কদাচিৎ হাদীসের মূল পাঠেও ইযতিরাব হয়ে থাকে। কিন্তু যেসব হাদীসের মূলে পাঠে শুধু ভিন্নতা রয়েছে; সনদে ভিন্নতা নেই সেসব হাদীসকে হাদীস শাস্ত্রবিদগণ সাধারণত মুযতারিব বলে অভিহিত করেন না। ইবনে হাজার আসকালানী, নুযহাতুন নাযার ফি তাউযীহি নুখবাতিল ফিকার ১/২৪

যদি হাদীসের মূল পাঠে শাব্দিক বৈপরিত্য থাকে কিন্তু সূত্রধারা ভিন্ন হয় তবে সেটাকে মুখতালাফুল হাদীস বলে অভিহিত করা হয়। আর মুখতালাফুল হাদীস বলা হয়, গ্রহণযোগ্য এমন হাদীস যা দৃশ্যত তার অনুরূপ অন্য একটি হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ।
পক্ষান্তরে যদি হাদীসের সূত্রধারা অভিন্ন হয় এবং তার শাব্দিক বৈপরিত্য খুব বেশি না হয়; বরং শব্দগুলো কাছাকাছি পর্যায়ের হয় তখন ধরে নেয়া হয় যে, মূলত এখানে হাদীস একটিই। কোনো বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে হয়তো সামান্য এ ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত যদি এ ব্যাপারটি এমন পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়ে থাকে যেখানে এধরনের ঘটনা একাধিক হওয়া সুদূর পরাহত সে ক্ষেত্রে তো এ জাতীয় হাদীসকে এক হাদীস বলেই গণ্য করতে হবে। তো যদি বাহ্যিক বিরোধপূর্ণ দু’টি হাদীসের মাঝে সমন্বয় সম্ভব হয় তবে সমন্বয় করবে। কারণ হাদীসের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যথসম্ভব হাদীসের মাঝে সমন্বয় করবে। বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রেখে দিবে না। আহমদ বিন উমর বিন সালিম বাযমুল, আলমুকতারিব ফি বয়ানিল মুযতারিব ১/১০৩, ১০৬, ১০৭, ড. মাহির ইয়াসীন ফাহল, শারহুত তাবসিরাহ ওয়াত তাযকিরাহ ১/২৪০, আল্লামা মুবারাকপুরী, তুহফাতুল আওয়াযী ২/৯১, ইবনে উসাইমিন, শারহুল মানজুমাতিল বাইকুনিয়্যাহ ১/১০৭, শাইখ আব্দুল্লাহ সা’দ, শারহুল মুকিযাহ ১/ ২২৩

হাফিয আলায়ী রহ. বলেন, মুযতারিব হাদীস হাদীসের যতগুলো শ্রেণীভাগ রয়েছে তন্মধ্য হতে সবচেয়ে বেশি দুর্বোধ্য এবং জটিল বিষয়। এ হাদীস সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করা একমাত্র ঐ ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব যাকে আল্লাহ তা‘আলা সূক্ষ্ম বোধশক্তি, বিস্তৃত নিরীক্ষা জ্ঞান, বর্ণনাকারীদের মান নির্ণয়বোধ এবং সমুজ্জ্বল প্রতিভা দান করেছেন। মুহাম্মদ সানআনী, তাউযীহুল আফকার ২/৩৭

মুযতারিব হাদীস সংক্রান্ত এ সংক্ষিপ্ত আলোচনার আলোকে কি সংশ্লিষ্ট হাদীসকে হাদীসে মুযতারিব বলে অভিহিত করা যায়?
আভিধানিক অর্থ বিবেচনায় যদিও মেনে নিই এতে ইযতিরাব রয়েছে তবে তা তো আপনারা যে বৃত্তে অবস্থান করেন সে বৃত্তে অবস্থানরত উলামায়ে কেরামের নিকট ইযতিরাব বলে গণ্য হওয়ার কথা নয়। কারণ আপনারা তো এক রাকআত বিতর নামাযের প্রবক্তা। একুশ এবং বিশ রাকা’আতের বর্ণনার মাঝে সমন্বয় সাধন করা আপনাদের নিকট খুব সহজেই সম্ভব। এরপরও যদি বলেন এ ধরনের ইযতিরাব দোষে হাদীস পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হবে তবে আমরা বলবো আপনাদের আট রাকআত সংক্রান্ত হাদীসের বর্ণনায় আট, এগারো এবং তেরো রাকআতের বর্ণনাও এসেছে। এমন কি সায়িব ইবনে ইয়াযীদ রহ. থেকে যার সূত্রে আপনারা আট রাকাআতের পক্ষে হাদীস বর্ণনা করেন সে মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ থেকেও একুশ রাকাআতের বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং আপনাদের আট রক’আত সংক্রান্ত হাদীসগুলোও ইযতিরাব দোষে দুষ্ট হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হবে।

আমরা স্বীকার করি, ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা রাযি. সূত্রে বর্ণিত বর্ণনায় বিশ, একুশ এবং তেইশ রাকাআতের বর্ণনাও এসেছে। তো শাব্দিক এ ভিন্নতা সম্পর্কে হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর বক্তব্য শোনা যাক। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন,
والاختلاف فيما زاد عن العشرين راجع إلى الاختلاف في الوتر وكأنه كان تارة يوتر بواحدة وتارة بثلاث. فتح الباري – ابن حجر – (৪ / ২৫৩
অর্থ : বিশ রাকাআতের অতিরিক্ত রাকাআত সংখ্যার বর্ণনার মাঝে যে বৈপরীত্য বিদ্যমান তা বিতরের রাকাআত সংখ্যার শব্দ বৈপরীত্যের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কখনো তিনি এক রাকাআত বিতর পড়তেন আবার কখনো তিন রাকাআত বিতর পড়তেন। ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ৪/২৫৩ (অসমাপ্ত)