ইতিকাফঃ অফুরন্ত সওয়াব ও লাইলাতুল কদর লাভের শ্রেষ্ঠ আমল

4 weeks ago admin 0

ইতিকাফের সংজ্ঞা

ইতিকাফ এটি একটি আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থে ইতিকাফ হল অবস্থান করা, কোন স্থানে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জাগতিক যাবতীয় কার্যকলাপ ও পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূণ্য লাভের উদ্দেশে মসজিদ বা ঘরের নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলা হয়।

ইতিকাফের শ্রেণীভাগ

ইতিকাফ তিন প্রকার। যথা,

১.     ওয়াজিব। যেমন, মান্নতের ইতিকাফ। এ ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত।

২.     সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। যেমন, রমাযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা। অর্থাৎ বড়ো গ্রাম বা শহরের প্রত্যেকটা মহল্লা এবং ছোটো গ্রামের পূর্ণ বসতিতে এক দুজন ইতিকাফ করলে সকলেই দায়মুক্ত হয়ে যাবে। আর কেউ ইতিকাফ না করলে সুন্নত পরিত্যাগের জন্য সবাই দায়ী হবে। বিশ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এ ইতিকাফের সময় সীমা।

৩.     মুস্তাহাব। যেমন, ওয়াজিব, সুন্নত ইতিকাফ ব্যতীত যে কোনো সময় ইতিকাফ করা। এর জন্য কোনো সময় নির্ধারিত নেই। সামান্য সময়ের জন্যও এ ইতিকাফ হতে পারে। এ ইতিকাফের কোনো কাযা নেই। Ñ সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৯৯৮, সুনানে আবু দাউদ হাদীস ২৪৭৩, আদদুররুল মুখতার ৩/৪২৯-৪৩৪, বাদাইয়ুস সানায়ি২/২৭৫, হাশিয়াতুত তহতবী আলা মারাকিল ফালাহ ৬৯৯, ৭০০, ৭০১

ইতিকাফের শর্তাবলী

ই’তিকাফের জন্য পাঁচটি শর্ত প্রযোজ্য। যথা :

১.     মুসলিম হতে হবে।

২.     বিবেচনা বোধসম্পন্ন হতে হবে।

৩.     সুন্নত ও ওয়াজিব ইতিকাফ এমন মসজিদে হতে হবে যেখানে জামাতের সাথে নামায আদায় হয়। এ শর্ত পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নারীগণ ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে ইতিকাফ করবে।

৪.     ইতিকাফের নিয়ত করতে হবে।

৫.     ঋতুস্রাব বা প্রসূতি অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হবে।Ñ সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৯৯৮, সুনানে আবু দাউদ হাদীস ২৪৭৩, আদদুররুল মুখতার ৩/৪২৯-৪৩৪, বাদাইয়ুস সানায়ি’ ২/২৭৫, হাশিয়াতুত তহতবী আলা মারাকিল ফালাহ ৬৯৯, ৭০০, ৭০১।

ইতিকাফের গুরুত্ব

ইতিকাফ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। ইসলামের বহু পূর্ব যুগ থেকেই এর প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. কে ইতিকাফকারীদের জন্য বাইতুল্লাহকে পবিত্র রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে পবিত্র রাখার নির্দেশ দিয়েছিলাম। (সূরা বাকারা- ১২৫)

পবিত্র সিয়াম পালনের মাধ্যমে মানুষ নিজ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে সরল সঠিক পথে চলার উপযুক্ত হয়ে উঠে। সিয়াম পালনের ধারাক্রমে মানুষের কর্মধারা একটি নিয়মতান্ত্রিকতায় চলে আসে। এক সময় সে তার প্রকৃত প্রেমাষ্পদ আল্লাহর সান্নিধ্য ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভে ব্যাকুল হয়ে উঠে। এমন শুভ লগনে আল্লাহ তাআলা চান, আমার বান্দা আমি বিনে জাগতিক যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে আমার দরবারে এসে পড়ে থাকুক। এতদিন সে কেবল দিনমান জৈবিক বাসনা পূরণ থেকে নিবৃত্ত ছিল। এখন প্রিয়তম মাহবূবে ইলাহীর সমীপে এসে পানাহার ব্যতিরেকে যাবতীয় বাসনা পূরণ থেকে নিবৃত্ত থাকবে তার তুষ্টি লাভের পরম আশায়। পার্থিব সর্বরকমের প্রেম-ভালবাসা থেকে হৃদয়কে শূন্য করে একমাত্র আল্লাহর প্রেম-ভালোবাসায় মনোজগতকে ব্যাপৃত রাখবে। হৃদয় রাজ্যে শুধু রাজাধিরজের রাজত্বই অবিচল থাকবে। এভাবে মানুষের চরম পাষাণ হৃদয়ও স্রষ্টার ভালোবাসায় বিনম্র ও বিগলিত হয়ে পড়ে। পরম করুণাময় আল্লাহ তো বান্দাকে মার্জনা করার সুযোগ সন্ধানে থাকেন। যখন কোন বান্দা পার্থিব সকল প্রকার বন্ধন ছিন্ন করে আল্লাহর দরবারে ছুটে আসবে আল্লাহ তাআলা তার কেমন আপ্যায়ন করবেন তা আমাদের অসুস্থ মস্তিষ্ক ধারণ করারও ক্ষমতা রাখে না। বান্দার আপ্যায়ন যে পবিত্র সত্তা সম্পন্ন করবেন তার অফুরন্ত ধনভাণ্ডার ও করুণার কথা বলে শেষ করার সাধ্য কার?

ইতিকাফের মর্যাদা

যদি কেউ পরিশুদ্ধ চিত্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ইতিকাফ করে তাহলে এটা তার জন্য মর্যাদাপূর্ণ বহু বড় উঁচু মানের ইবাদত বলে পরিগণিত হবে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফের ব্যাপারে বিষম গুরুত্বারোপ করতেন। ইমাম যুহরী রহ. বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক আমল কখনো করতেন কখনো পরিত্যাগ করতেন। কিন্তু তিনি মাদানী জীবনে জিহাদের সুমহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি মাত্র ইতিকাফ ব্যতিরেকে কোন ইতিকাফই পরিত্যাগ করেননি।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ আমরা এ ইতিকাফের ব্যাপারে কোন গুরুত্বই দিই না। পবিত্র মাসে ইতিকাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রমাযানের রহমত বরকত বিশেষত লাইলাতুল কদর লাভের জন্য ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদানী জীবনে মাত্র একটি রমাযানে জিহাদে রত থাকার কারণে ইতিকাফ করতে পারেননি। তবে পরবর্তী বছর বিশদিন ইতিকাফ করে তা পূরণ করেছেন। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ইতিকাফে অংশগ্রহণ করেছেন। সুতরাং ইতিকাফ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাত আমল। যদি কোন মসজিদ ইতিকাফশূন্য থাকে তাহলে পুরো এলাকাবাসী সুন্নাতে মুআক্কাদা বর্জনের কারণে গুনাহগার হবে। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রমাযানে দশদিন ইতিকাফ করতেন। তবে তিরোধানের বছর বিশদিন ইতিকাফ করেছেন। (সহীহ বুখারী; হা.নং ২০৪৪)

ইতিকাফের মাহাত্ম সম্পর্কে হাদীসের ভাষ্য হল, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করবে আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আকাশ-ভূমির দূরত্বের অধিক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (আলজামি’ লিশুআবিল ঈমান; হা.নং ৩৯৬৫)

ইতিকাফের উপকারিতা

আবু সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু সাঈদ খুদরী রা. এর নিকট গিয়ে বললাম, আমাদের নিয়ে হাদীস বর্ণনার উদ্দেশে খেজুর বাগানে যাবেন না? আবু সাঈদ খুদরী রা. খেজুর বাগানে গেলেন। তখন আমি বললাম, লাইলাতুল কদর সম্বন্ধে আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু শুনেছেন আমাদের বলুন। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের প্রথম দশকে ই’তিকাফ করলেন। আমরাও তাঁর সাথে ইতিকাফ করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিবরীল আ. এসে বললেন, আপনি যে বিষয় কামনা করছেন তা আপনার সম্মুখভাগে। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্য দশকে ইতিকাফ করলেন। আমরাও তাঁর সাথে ইতিকাফ করলাম। পুনরায় জিবরীল আ. এসে বললেন, আপনি যে বিষয় কামনা করছেন তা আপনার সম্মুখভাগে। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের বিশতম দিনে সকাল বেলা সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ দিলেন। সে ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ইতিকাফ করেছে তারা যেন (ইতিকাফ করার জন্য) আবার (মসজিদে) চলে আসে। কারণ আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে। তবে তার নির্দিষ্ট সময়টা আমাকে বিস্মৃতি করে দেয়া হয়েছে। তবে (এতটুকু বলতে পারি) সেটা শেষ দশকের বেজোড় রজনীতে হবে। আমি দেখলাম, যেন আমি কাঁদা মাটিতে সেজদা করছি। তখন মসজিদের ছাদ ছিল খর্জুর ডালার ছাউনি। (আমরা মসজিদে প্রবেশ করে) আকাশে কিছুই দেখতে পাই নি। হঠাৎ আকাশে এক খণ্ড মেঘ দেখা গেল এবং বৃষ্টি হল। বৃষ্টিতে আমরা ভিজে গেলাম। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্বপ্ন-বর্ণনার সত্যতা স্বরূপ তাঁর ললাট ও নাসিকার অগ্রভাগে কাঁদা-মাটির নিদর্শন দেখতে পেলাম। সহীহ বুখারী, হাদীস ৮১৩।

  • ইতিকাফকারী অবসর সময়ে কোন আমল না করলেও তার দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা ইবাদত হিসেবেই গণ্য হয়।
  • ইতিকাফের মাধ্যমে অসংখ্য গুনাহ থেকে পরিত্রাণ লাভ করা যায়।
  • পাপাচারের সয়লাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য আল্লাহ তাআলার ঘর যেন লৌহপ্রাচীর বেষ্টিত চির সংরক্ষিত এক মহা দূর্গ।
  • ইতিকাফের মাধ্যমে নিজেকে জাগতিক নানা ঝামেলা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নিকট সঁপে দেয়া হয়।
  • ইতিকাফের দ্বারা চব্বিশ ঘণ্টা ফেরেশতাসুলভ আচরণের উপর অবিচল থাকার চমৎকার প্রশিক্ষণ হয়।
  • রোযার যাবতীয় বিধি-নিষেধ ও হক যথাযথভাবে আদায় করে পরিপূর্ণ রোযা পালনের জন্য ইতিকাফ যথেষ্ট কার্যকর।
  • ইতিকাফ আল্লাহ তাআলার মেহমান হয়ে তাঁর সাথে প্রেম-ভালোবাসা সৃষ্টি করার অন্যতম মাধ্যম। মহান প্রভুর সাথে একান্ত সংলাপে ইতিকাফের বিকল্প হয় না। মসজিদে অবস্থান করার কারণে ইতিকাফকারী যে সকল পূণ্যময় আমল করতে অক্ষম সেসব আমল না করেও সে তার সওয়াব লাভ করতে থাকে।

ইতিকাফ সংক্রান্ত বিবিধ মাসআলা

  • মাসনূন ইতিকাফ যেহেতু রমাযানের শেষ দশদিন ব্যাপী, তাই প্রথম থেকেই পুরো দশদিন ইতিকাফ করার নিয়ত করবে। একসাথে দশদিনের নিয়ত না করলে সুন্নাত ইতিকাফ আদায় হবে না; বরং তা নফল ইতিকাফে পরিণত হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১১)
  • ২০ রমাযান সূর্যাস্তের পূর্বেই ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে পৌঁছে যাওয়া আবশ্যক। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৪২)
  • মাসনূন ইতিকাফ আরম্ভ করলে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। বিনা কারণে তা ভঙ্গ করার অনুমতি নেই। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৪৫)
  • মাসনূন ইতিকাফ আরম্ভ করার পর যদি দুই-একদিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায় তাহলে পরবর্তীতে রোযাসহ সেই কয়দিনের ইতিকাফ কাযা করে নিতে হবে। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৪৫)
  • ইতিকাফরত অবস্থায় তিলাওয়াত, তাসবীহ, তাহলীল ও ইবাদত-বন্দেগীতে ব্যাপৃত থাকা চাই। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১২)
  • ইতিকাফের দিনগুলোতে কিছু কিছু সময় দীন সম্বন্ধে আলোচনা করা ও আলোচনা শুনা উচিত। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১২)
  • পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ইতিকাফ করা ও করানো কোনটিই জায়েয নয়। হ্যাঁ, প্রথাসর্বস্ব না হলে হাদিয়া-উপঢৌকন দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই। (মাসাইলে ইতিকাফ; পৃষ্ঠা ১৫-১৬)
  • পুরুষরা মসজিদে ইতিকাফ করবে। আর নারীরা তাদের ঘরে নামাযের নির্দিষ্ট স্থানে ইতিকাফ করবে। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৪০-৪৪১)
  • নারীরা তাদের ইতিকাফের স্থানকে পর্দা দ্বারা ঢেকে নিবে। যাতে ঘরোয়া পরিবেশ থেকে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি হয় এবং কোন পরপুরুষের কারণে স্থান পরিবর্তন করতে না হয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১১)
  • ইতিকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য শরীয়ত অনুমোদিত মসজিদ হওয়া আবশ্যক। চাই তা জামে মসজিদ হোক বা পাঞ্জেগানা মসজিদ হোক।

ইতিকাফ অবস্থায় যেসব কার্যক্রমের অবকাশ রয়েছে

  • অন্যান্য রোযাদারের মত রাতের বেলায় শরীয়তসম্মত সব ধরনের পানাহারই ইতিকাফকারীর জন্য জায়েয। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১২)
  • প্রয়োজনীয় জাগতিক কথাবার্তা বলারও অবকাশ রয়েছে। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৫০)
  • জরুরী চিঠিপত্র লেখা এবং ধর্মীয় বইপত্র ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করা জায়েয আছে। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৫০)
  • মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় শুধু ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা জায়েয আছে। তবে পণ্য মসজিদের ভিতরে এনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১৩)
  • ডাক্তারগণ প্রয়োজন বশত ইতিকাফ অবস্থায় চিকিৎসাপত্র লিখতে পারবেন। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৪৫)
  • মল-মূত্র ত্যাগ, উযূ (ফরয হোক বা নফল), ফরয ও সুন্নাত গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়ার অবকাশ রয়েছে। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১২)
  • মসজিদে খাবার পৌঁছে দেয়ার মত কেউ না থাকলে নিজে গিয়ে তা আনতে পারবে। তবে বিলম্ব করা যাবে না এবং মসজিদের বাইরে খাবার খাওয়া যাবে না। (মাসাইলে ইতিকাফ; পৃষ্ঠা ৩৪)
  • আযান দেয়ার ব্যবস্থা মসজিদের বাইরে হলে মুআযযিন ইতিকাফকারীর জন্য বাইরে গিয়ে আযান দেয়া জায়েয আছে। (ফাতাওয়া শামী ২/৪৪৫)
  • পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফে বসলে জুমুআর নামাযের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া জায়েয আছে। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/২১২)
  • ওযু ইস্তেঞ্জার জন্য বের হলে যদি কোনো জানাযা উপস্থিত হয়ে যায় তাহলে পথে বিলম্ব না করে জানাযা নামাযে অংশগ্রহণ করা জায়েয আছে। মাসায়েলে ইতিকাফ ৪৩
  • ফরজ এবং মাসনূন গোসল ব্যতিরেকে স্বাভাবিক গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়ার অবকাশ নেই। তবে খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দিলে মসজিদের ভিতরে বসে মাথা বাহিরে বের করে সংক্ষিপ্ত পরিসরে গোসল সেরে নিবে। এতেও সমস্যার সমাধান না হলো কোনো কোনো মুফতী মহোদয়ের ফিকহী অভিমত অনুসারে নিকটে গোসলের ব্যবস্থা থাকলে ওযু-ইস্তেঞ্জাকালীন বের হয়ে দ্রুত গোসল করে নেয়ার অবকাশ রয়েছে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১৩
  • ইতিকাফ কালীন কুরআন শিক্ষা দেয়া এবং দীনী বিষয়াদী শিক্ষা দেয়া জায়েয আছে। আদ্দুর রুল মুখতার ১/৪৪৯
  • ইতিকাফরত অবস্থায় শরীরে তেল-সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং চুল-দাড়ি আঁচড়ানোর অনুমতি আছে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১৩
  • ইতিকাফ অবস্থায় নীরব থাকাকে সওয়াবের কাজ মনে করা মাকরুহে তাহরীমী। প্রাগুক্ত
  • ইতিকাফকারী বিশেষ প্রয়োজনে বের হলে তাড়াহুড়া করবে না; বরং ধীরস্থিরভাবে কাজ সম্পন্ন করবে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১২
  • মসজিদ এক তল বিশিষ্ট হোক বা বহুতল বিশিষ্ট হোক ছাদ মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হবে। তেমনিভাবে মসজিদের মিনারাও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুতরাং ইতিকাফকারী মসজিদের ছাদ ও মিনারায় গমন করতে পারবে। প্রাগুক্ত

ইতিকাফ ভঙ্গের কারণসমূহ

১.     স্ত্রী সহবাস করা।

২.     চুম্বন ও আলিঙ্গনের কারণে বীর্যপাত হওয়া।

৩.     ইতিকাফের স্থান থেকে শরীয়ত সম্মত বা প্রাকৃতিক প্রয়োজন ব্যতীত বের হওয়া।

৪.     ধর্মচ্যুত হওয়া।

৫.     মাতাল হওয়া।

৬.     দীর্ঘ সময় অজ্ঞান ও উন্মাদ হয়ে থাকা।

৭.     ঋতুশ্রাব ও প্রসূতি অবস্থা সৃষ্টি হওয়া।

৮.     সুন্নত এবং ওয়াজিব ইতিকাফের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় দিনের বেলা আহার করা। আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু ৩/১৪৫, রদদুল মুহতার ৩/৪৩১,৪৩২,৪৩৭, ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ ৬/৫০৫।

ইতিকাফে আগ্রহী নারীদের জন্য করণীয় বিষয়াবলী

  • নারীরা তাদের নিজ গৃহে নামাযের স্থানে ইতিকাফ করবে। নামাযের জন্য পূর্ব থেকে কোনো নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলে তা নির্দিষ্ট করে নিবে। এরপর সেখানে ইতিকাফ করবে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১১, রদ্দুল মুহতার ২/৪৪১
  • যদি কোনো নারীর স্বামী বৃদ্ধ বয়সী বা অসুস্থ হয় কিংবা তার শিশু সন্তান থাকে এবং তাদের সেবা শুশ্রষা করার কেউ না থাকে তাহলে সে নারীর জন্য ইতিকাফ করার চেয়ে তাদের সেবা যত্ন করা শ্রেয়।
  • ঋতুস্রাব অবস্থায় ইতিকাফ করার অনুমতি নেই। কারণ এ অবস্থায় রোযা রাখাই বিধেয় নয়। অথচ মাসনূন ইতিকাফের জন্য রোযা রাখা আবশ্যক। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১১
  • নারীদের ইতিকাফ করতে হলে তাদের স্বামীদের অনুমতিক্রমেই ইতিকাফ করতে হবে। স্বামীর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইতিকাফ করলে সে ইতিকাফ সহীহ হবে না। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১১

পরিশিষ্ট

পবিত্র রমাযানের গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি আমল হল ইতিকাফ। এর মাধ্যমে বান্দা লাভ করতে পারে হাজারো মাসের চেয়ে উত্তম রজনী লাইলাতুল কদরের সন্ধান। তাই ইতিকাফকারীকে হবে হবে সদা সতর্ক চৌকান্না। যাতে কোনো ক্রমেই লাইলাতুল কদর হাত ছাড়া না হয়ে যায়। এজন্য তাকে উপরোক্ত বিধি-নিষেধগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। তবেই আশা করা যায়, ইতিকাফের সময়গুলো তার স্বার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত হবে। অযথা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, গল্পগুজব আর হাসি তামাশা করে এত মূল্যবান সময়গুলোকে নষ্ট করা কোনো ক্রমেই উচিৎ হবে না। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইতিকাফ করার এবং সকল ইতিকাফকারীকে যথাযথ ইতিকাফ পালনের মাধ্যমে তার সন্নিধান লাভের তাওফীক দান করুন।