তারাবীহ নামাযের রাকাআত সংখ্যাঃ একটি দালিলিক পর্যালোচনা

7 months ago admin 0

তারাবীহ নামায কয় রাকাআত? এটি একটি আলোচিত প্রশ্ন। রমাযান ঘনিয়ে এলে এ নিয়ে চলে তুমুল বিতর্ক। ৮-২০ এর টানাপড়েনে সাধারণ মানুষ পড়ে চরম বিভ্রান্তিতে। আমরা বক্ষমান নিবন্ধে নির্মোহ দৃষ্টিতে তারাবীহ নামাযের রাকাত সংখ্যার একটি দালিলিক আলোচনা উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো।
তারাবীহ নামায বিশ রাকাআত এবং এ সংক্রান্ত কিছু তথ্যপ্রমাণ
১. ইরবাজ বিন সারিয়া রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার তিরোধানের পর তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তারা নানা ধরনের মতভিন্নতা দেখতে পাবে। সে ক্ষেত্রে তোমরা আমার এবং আমার সত্যনিষ্ঠ সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সুন্নাহ ও আদর্শকে গ্রহণ করবে। একে তোমরা আকড়ে ধরবে এবং দন্ত্যমড়ির সাহায্যে কামড়ে ধরার ন্যায় প্রাণপনে আকড়ে ধরবে।…এবং তোমরা (ধর্মীয় বিষয়ে) নবাবিস্কৃত বিষয়াদি থেকে খুব সতর্কতার সাথে নিবৃত্ত থাকবে। কারণ প্রতিটি নবাবিস্কৃত বিষয়ই হলো বিদাত। আর প্রতিটি বিদাতই হলো পথভ্রষ্টতা।-সুনানে আবুদাউদ, হাদীস ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২৬৭৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৬৬৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫

২. উরওয়া রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা গভীর রাতে কক্ষ থেকে বের হলেন। এরপর মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করলেন। অন্যান্য লোকজনও তার সাথে সে নামায আদায় করলো। ভোর বেলা লোকজন এ বিষয়টি নিয়ে কথা-বার্তা বলতে শুরু করলো। পরদিন রাতে গত রাতের তুলনায় আরো বেশি লোকজন একত্রিত হলো। এবং তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামায পড়লো। দ্বিতীয় দিন ভোর বেলা সবাই এ বিষয়টি নিয়ে আবার পরস্পরের সাথে আলোচনা শুরু করে দিলো। ফলে তৃতীয় দিন রাতে লোকের সংখ্যা আরো বেড়ে গেলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়ে নামায পড়লেন। তাঁর সাথে আগত সাহাবায়ে কেরামও সে নামায আদায় করলেন। চতুর্থ দিন রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। ফজরের নামাযে মসজিদে গিয়ে যখন নামায শেষ করলেন তখন সাহাবাদের দিকে মুখ করে বসলেন। এরপর আল্লাহর একত্ববাদ এবং আল্লাহর রাসূল হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য পাঠ করলেন। এরপর বললেন, আজ রাতে তোমাদের মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে অজ্ঞাত ছিল না। তবে আমি আশঙ্কা বোধ করছিলাম, না জানি তোমাদের উপর এ নামায ফরজ হয়ে যায়। এরপর সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অক্ষমতার ব্যাপারটি সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এন্তেকাল করেন। আর গভীর রাতের নামাযের ব্যাপারটি সেভাবেই থেকে যায়।-সহীহ বুখারী, হাদীস ২০১২

৩. আব্দুর রহমান বিন আব্দুল কারী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমাযানের এক রাতে আমি উমর রা. এর সাথে মসজিদে গেলাম। তখন আমরা দেখতে পেলাম, কেউ একাকি নামায পড়ছে, কেউ গুটি কয়েকজন লোক নিয়ে জামাতবদ্ধ হয়ে নামায পড়ছে। তখন উমর রা. বললেন, আমার মনে হয যদি সকলে একজন ইমামের পেছনে নামায আদায় করতো তাহলে বিষয়টি শ্রেষ্ঠতর হতো। এরপর দৃঢ়ভাবে সংকল্প বদ্ধ হলেন এবং সবাইকে উবাই ইবনে কা‘ব রা. এর পেছনে একত্রিত করলেন। এরপর অন্য একদিন রাতে আমি উমর রা. এর সাথে মসজিদে গেলাম। তখন দেখতে পেলাম সকল লোক তাদের এক ইমামের পেছনে নমাজ আদায় করছে। তখন উমর রা. বললেন, এটা কত সুন্দর একটি নতুন বিষয়! শুরু রাতে যে নামায পড়া হয় তার তুলনায় শেষ রাতের নামায উত্তম। লোকজন তখন শরু রাত্রে নামায আদায় করতো।-সহীহ বুখারী, হাদীস ২০১০

৪. ইবনে আব্দুল বার রা. বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. নতুন কিছু করেননি। তিনি তাই করেছেন যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করতেন। কিন্তু নিয়মিত জামাতের কারণে তারাবীহ নামায উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত জামাতের ব্যবস্থা করেননি। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের ব্যাপারে ছিলেন খুবই দয়াবান এবং যারপরনাই অনুগ্রহশীল। উমর রা. বিষয়টি জানতেন। তিনি দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এন্তেকালের পর ফরজের মাঝে কোনো রূপ সংজোযন বিয়োজন হবে না। তাই তিনি নবী-পছন্দের প্রতি লক্ষ্য করে ১৪ হিজরীতে তারাবীহ নামাযের একটি জামাতবদ্ধ রূপ দাঁড় করালেন। আল্লাহ তা‘আলা যেন তার জন্যই এ মর্যাদার আসনটি নির্ধারিণ করে রেখেছিলেন। আবু বকর রা. এর মনে এ চিন্তা উদগত হয়নি। যদিও সামগ্রিকভাবে তিনিই উত্তম ও অগ্রগণ্য ছিলেন। আলী রা. উমর রা. এর এ উদ্যোগটিকে উত্তম বিবেচনা করেন এবং এটিকে প্রাধান্য দেন। এবং বলেন, এটি হলো রমাযন মাসের জ্যোতির্ময় আলো।-ইবনে আব্দুল বার, আত তামহীদ লিমা ফিল মুয়াত্তা মিনাল মায়ানী ওয়াল আসানীদ ৮/১০৮

৫. সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবা এবং তাবিয়ীন) উমর রা. এর যুগে রমাযান মাসে বিশ রাকাত পড়তেন। তিনি আরো বলেন, তাঁরা নামাযে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরা পাঠ করতেন। এবং উসমান রা. এর যুগে তাদের কেউ কেউ নামায দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে লাঠি ভর করে দাঁড়াতেন।-ইমাম বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ২/৪৯৬/৪৮০১

৬. সায়িব বিন ইয়াজিদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা উমর রা. এর যুগে বিশ রাকাত (তারাবীহ) এবং বিতির পড়তাম।- ইমাম বাইহাকী, মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার ২/২২৭। হাদীসটি সনদ বিবেচনায় সহীহ। হাদীস এবং ফিকহের অনেক ইমাম এই হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। যথা ইমাম নববী, তাকিউদ্দীন সুবকী, ওয়ালিউদ্দীন ইরাকী, বদরুদ্দীন আইনী এবং জালালুদ্দীন সুয়ূতী প্রমুখ। প্রয়োজনে দেখা যেতে পারে।- আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব ৩/৫২৭, নাসবুর রায়াহ ২/১৫৪, উমদাতুল কারী শরহু সহীহিল বুখারী ৭/১৭৮, ইরশাদুস সারী শারহু সহীহিল বুখারী ৪/৫৭৮, আল মাসাবীহ ফি সালাতিত তারাবীহ ২/৭৪ ইত্যাদি
সায়িদ বিন ইয়াজিদ রা. এর উপরোক্ত হাদীসটিকে শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. এবং আব্দুর রাহমান মুবারকপুরী রাহ. জয়ীফ বলতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের জানা মতে ইতিপূর্বে হাদীস বা ফিকহের কোনো ইমাম কিংবা কোনো একজন মুহাদ্দিস ও তাত্ত্বিক আলিম হাদীসটিকে জয়ীফ বলেননি। এ বিষয়ে শায়খ আলবানী রাহ. যেসব স্থানে ত্রুটি বিচ্চুতিতে আক্রান্ত হয়েছেন তার মধ্য হতে বেশ কিছু জায়গা দলীল প্রমাণের আলোকে চিহ্নিত করেছেন সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার প্রাক্তন গবেষক মুহাদ্দিস ইসমাইল বিন আনসারী তার অনবদ্য গ্রন্থ ‘তাসহীহু সালাতিত তারাবীহ ইশরীনা রাকআতান ওয়ার রদ্দু আলাল আলবানী ফি তাযয়ীফিহী’ গ্রন্থে আর মুবারকপুরী রাহ. যেসব ত্রুটি বিচ্চুতির শিকার হয়েছেন তার স্বরূপ চিহ্নিত করেছেন মাওলানা হাবীবুর রহমান আ‘জমী রা. তার ‘রাকাআতে তারাবীহ’ গ্রন্থে।

৭. ইয়াজিদ বিন রুমান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবা এবং তাবিয়ীগণ উমর রা. এর যুগে রমাযান মাসে তেইশ রাকাত পড়তেন। মুয়াত্তা মালিক ২/১৫৯/৩৮০
৮. আব্দুল আযীয বিন রুফাই রা. বলেন, উবাই বিন কা‘ব রা. রমাযান মাসে মসজিদে নববীতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন।-মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদীস ৭৭৬৬
উপরোক্ত হাদীসগুলো বর্ণনাগত দিক থেকে মুরসাল। আর পূর্বসূরি ইমামদের মতানুসারে তাবিয়ী ইমামদের মুরসাল বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। বিশেষত একই বিষয়ে যদি একাধিক মুরসাল বর্ণনা থাকে কিংবা মুরসাল বর্ণনার সমর্থনে উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন সম্মিলিত কর্মধারা বিদ্যমান থাকে তবে তো তার প্রামাণিকতার বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রা. বলেন, যে মুরসাল বর্ণনার অনুকূলে অন্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় কিংবা পূর্বসূরিগণ যার অনসরণ করেছেন তা ফকীহগণের সর্বসম্মতিক্রমে দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।-ইকামাতুদ দলীল আলা ইবতালিত তাহলীল ১/৭৫

৯. ইমাম ইবনে তাইমিয়া রা. আরো বলেন, …এবিষয়টি প্রমাণিত, উবাই বিন কা‘ব রা. রমাযান মাসে মুসল্লীদের নিয়ে বিশ রাকাআত (তারাবীহ) পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন।- ইমাম ইবতে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১২

১০. বিশ রাকাত তারাবীহ সম্বন্ধে অন্যত্র ইবনে তাইমিয়া রা. বলেন, খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ এবং মুসলিম জাতির সম্মিলিত কর্ম দ্বারা এটি প্রমাণিত।- ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১৩

১১. আবু আব্দুর রাহমান সুলামী রা. বলেন, আলী রা. এক রমাযানে কারীদেরকে (হাফেজদের) ডাকলেন। তাদের মধ্য হতে একজনকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়াতে বললেন। বর্ণনা কারী আরো বলেন, আলী রা. তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। হাদীসটি আলী রা. থেকে অন্য একটি সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে।-ইমাম বাইহাকী রা., আসসুনানুল কুবরা (আলজাওহারুন নাকী সংযুক্ত) ২/৪৯৬/৪৮০৪

১২. আবুল হাসনা রা. থেকে বর্ণিত, আলী রা. এক রমাযানে এক ব্যক্তিকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত নামায পড়ার নির্দেশ দিলেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ ১৫/৪২৯/২২৭
উপরোক্ত হাদীস দুটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কারণ দুটি হাদীসই হাসান পর্যায়ভুক্ত। দেখা যেতে পারে আলজাওহারুন নাকী, ইবনুত তুরকুমানী ২/৪৯৫
উপরন্তু, ১১তম হাদীসটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রা. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ গ্রন্থে (২/২২৪) এবং ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রা. আলমুনতাকা গ্রন্থে (৫৪২) দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, আলী রা. তারাবীহের জামাত এবং রাকাত সংখ্যা বিষয়ে দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুক রা. এর নীতির উপরই ছিলেন।
১৩. ইমাম আতা বিন আবী রাবাহ রা. বলেন, আমি লোকদেরকে (সাহাবা এবং প্রথম সারির তাবিয়ী) দেখেছি, তাঁরা বিতরসহ তেইশ রাকাত পড়তেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ২/২৮৫। আর আতা বিন আবি রাবাহ রা. তো নিজেই বলেছেন, আমি দুই শত জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তাহযীবুল কামাল ১৩/৪৯

১৪. ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, এটা প্রমাণিত, উবাই বিন কা‘ব রা. রমাযান মাসের তারাবীহতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তাই বহু আলেমের সিদ্ধান্ত, এটিই সুন্নত। কারণ উবাই বিন কা‘ব রা. মুহাজির এবং আনসার সাহাবীদের উপস্থিতিতেই বিশ রাকাত পড়িয়েছেন এবং তাতে কেউ কোনো ধরণের আপত্তি তোলেনি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১২

১৫. ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. বলেন, আমি ইমাম আবু হানীফা রাহ. কে তারাবীহ এবং এ বিষয়ে উমর রা. এর কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে প্রশ্ন করি। তিনি প্রতি উত্তরে বলেছেন, তারাবীহ হলো, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। উমর রা. এটিকে নিজের পক্ষ থেকে অনুমান করে নির্ধারণ করেননি এবং তিনি এ ব্যাপারে নতুন কিছু আবিস্কারও করেননি। তিনি দলীলের ভিত্তিতে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত কোনো নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই আদেশ দান করেছিলেন। তাছাড়া উমর রা. যখন এই নিয়ম চালু করেন এবং উবাই বিন কা‘ব রা. এর ইমামতিতে লোক সকলকে একত্রিত করেন এবং লোকজনও স্বতস্ফূর্তভাবে জামাতবদ্ধভাবে এ নামায আদায় করতে থাকেন তখন সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা ছিল প্রচুর। যাদের মধ্যে উসমান, আলী, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আব্বাস, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, তালহা, যুবায়ের, মুআজ ও উবাই রা. প্রমুখ বড় বড় মুহাজির এবং আনসার সাহাবী বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের কেউ এ ব্যাপারটিকে প্রত্যাখান করেননি। বরং সবাই তাকে সমর্থন করেছেন, তার সাথে একমত হয়েছেন এবং অন্যদেরকে এব্যাপারে আদেশ করেছেন।Ñআল ইখতিয়ার লি তালীলিল মুখতার, ইমাম আবুল ফজল মাজদুদ্দীন আল মাওসিলী ১/৭০

১৬. বিশিষ্ট তাবিয়ী আবুল আলিয়া উবাই বিন কা‘ব রা. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, উমর রা. উবাই বিন কা‘ব রা. কে রমযান মাসে লোকদের নিয়ে নামায পড়ার আদেশ করতে গিয়ে বলেন, লোকজন দিনের বেলা রোজা রাখে। কিন্তু রাতের বেলা উত্তমরূপে কুরআন পড়তে পারে না। আপনি যদি তাদের সামনে কুরআন পড়তেন ! তখন উবাই বিন কা‘ব রা. উত্তরে বলেন, আমীরুল মু‘মিনীন এ বিষয়টি তো পূর্বে ছিল না। উত্তরে তিনি বলেন, তা আমি জানি। তবে এ বিষয়টি সর্বাধিক উত্তম। এরপর উবাই রা. লোকজন নিয়ে বিশ রাকাত নামায পড়েন।- আলআহাদীসুল মুখতারা, ইমাম জিয়াউদ্দীন মাকদেসী ১/৪৮১/১১৬১

হাদীসটিতে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ছোট ছোট কয়েকটি জামাতকে একত্র করে একজন ইমামের পেছনে একটি বড় সড় জামাতের রূপ দান করা একটি ব্যবস্থাপনাগত বিষয়। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো কথা নয়। বাস্তবে নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোনো দলীল প্রমাণও নেই। বরং বিষয়টি শরীয়তের রুচির সাথে বেশ সাযুজ্যপূূর্ণ। তথাপি উবাই বিন কা‘ব রা. এব্যাপারে নিজের সংশয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এভাবে এক জামাতে তারাবীহ পড়ার ব্যবস্থা তো পূর্বে ছিল না।’ উমর রা. তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলে তিনি সম্মত হন। কিন্তু তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে তাকে কিছু বলতে হয়নি। তিনি বিনা দ্বিধায় বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়িয়েছেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো ? যদি বিশ রাকাআত তারাবীহ এর ব্যাপারে তাঁর কাছে নববী আদর্শ বিদ্যমান না থাকত তাহলে তো তিনি আরো শক্ত করে বলতেন, ‘এ বিষয়টি তো আগে ছিল না।’ কিন্তু রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে তিনি এমন প্রশ্ন করেননি।

যারা বলেন, তারাবীহ নামায আট রাকাআত তারা তাহাজ্জুদ বিষয়ক একটি সহীহ হাদীসকে আট রাকাত তারাবীহ এর সপক্ষে ব্যবহার করে থাকেন। আর বলে থাকেন তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ এক নামাযেরই দুই নাম। যে নামায এগারো মাস তাহাজ্জুদ থাকে তা রমাযানে এসে তারাবীহ হয়ে যায়। তাদেরকে যখন বিনীত সুরে বলা হয়, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ এক নামায সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ করুন। সাথে সাথে এ কথাও প্রমাণ করুন তাহাজ্জুদের নামায আট রাকাতের চেয়ে বেশি পড়া যায় না তখন তাদের পক্ষ থেকে কোনো হাদীসই প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। অথচ তারা বলে থাকেন, তারাবীহ নামায আট রাকাআতের বেশি পড়া নাজায়েজ বা বিদআত। কিন্তু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তাহাজ্জুদের রাকাত সংখ্যা নির্ধারিত নয়। দুই রাকাআত করে যত ইচ্ছা পড়তে থাকুন। যখন সুবহে সাদিক হওয়ার আশঙ্কা হবে তখন বিতর পড়ে নিন। হাদীসে এসেছে, তোমরা (তাহাজ্জুদ) ও বিতর পাঁচ রাকাআত পড়, সাত রাকাআত পড়, নয় রাকাআত পড়, এগারো রাকাআত পড় কিংবা তার চেয়ে বেশি পড়। সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২৪২৯, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ১১৭৮
ইমাম যাইনুদ্দীন ইরাকী রহ. প্রমুখ বলেছে, হাদীসটি সহীহ। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/৪৩, আত-তালখীসুল হাবীর, ইবনে হাজার আসকালানী ২/১৪

তারাবীহ নামায আট রাকাআত বিষয়ক তথ্য-প্রমাণ এবং কিছু কথা

১. তাহাজ্জুদ বিষয়ক যে হাদীসটি তারাবীহ এর ব্যাপারে ব্যবহার করা হয় তা সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান মাসে এবং অন্যান্য মাসে চার রাকাআত করে আট রাকাআত এবং তিন রাকাআত বিতরÑসর্বমোট এগারো রাকাআতের চেয়ে বেশি পড়তেন না। অথচ এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সার্বক্ষণিক আমল ছিল না। কারণ খোদ আম্মাজান আয়েশা রা. এর সূত্রেই তাহাজ্জুদের নামায ফজরের সুন্নত ব্যতিরেকে তের রাকাআত হওয়াও প্রমাণিত আছে। দেখা যেতে পারে সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৬৪; ফাতহুল বারী ৩/২৬; কিতাবুত তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১০।
অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাত্রের নামায ঈশার দুই রাকাআত সুন্নত ও বিতর ছাড়া কখনো কখনো সর্বমোট চৌদ্দ রাকাআত বা ষোল রাকাআতও হতো; বরং কোনো বর্ণনামতে আঠারো রাকাআতও প্রমাণিত হয়। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/২১, হাদীস নাম্বার ৮৯৭; আত-তারাবীহু আকসারা মিন আলফি আম ফিল মাসজিদিন নাবাবী, আতিয়্যা মুহাম্মদ সালেম, সৌদি আরব ২১
উপরন্তু যদি হাদীসটি তারাবীহ প্রসঙ্গে হতো তাহলে স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন মসজিদে নববীর বিশ রাকাআত তারাবীহ এর উপর আপত্তি করতেন। ১৪ হিজরী থেকে নিয়ে উম্মুল মুমিনীনের মৃত্যু সন ৫৭ পর্যন্ত অবিরাম চল্লিশ বছর তাঁর কক্ষ সংলগ্ন মসজিদে নববীতে বিশ রাকাআত তারাবীহ হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন কি কখনো এর উপর আপত্তি করেছেন? তার কাছে তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে একটি অকাট্য হাদীস থাকবে আর তাঁর সামনে চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই হাদীসের বিরোধিতা হবে, তারপরও তিনি নীরব নিশ্চুপ থাকবেন? এটা কি কখনো সম্ভব ?

২. আট রাকাআত সংক্রান্ত উপস্থাপিত দ্বিতীয় দলীলটি হলো, ইসা বিন জারিয়া রা. জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, রমাযানের এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে আট রাকাআত (তারাবীহ) এবং বিতর পড়লেন। পরদিন আমরা মসজিদে একত্রিত হলাম। আশা করছিলাম তিনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন। সকাল গড়িয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আশঙ্কা করেছিলাম, তোমাদের উপর বিতর ফরজ করে দেয়া হবে। সহীহ ইবনে খুজাইমা ২/১৩৮/১০৭০
হাদীসটির সনদ-সূত্রে ইসা বিন জারিয়া নামের একজন বর্ণনা কারী রয়েছেন। হাদীস শাস্ত্রের কতিপয় ইমাম তাকে মাতরুক এবং মুনকারুল হাদীস বলে অভিহিত করেছেন। মাতরূক অর্থ, পরিত্যাজ্য; যার বর্ণনা দলীল বা সমর্থক দলীল কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুনকারুল হাদীস হলো, এমন একজন বর্ণনাকারী যিনি ভুল বা আপত্তিকর কথাকে ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীস হিসেবে বর্ণনা করে।

ইমাম ইবনে আদী রহ. উপরোক্ত হাদীসটিকে গায়রে মাহফুজ সাব্যস্ত করেছেন। ইবনে আদী রহ. এর পরিভাষায় গায়রে মাহফুজ শব্দটি মুনকার বা বাতিল বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইমাম আবু দাউদ রাহ. বলেন, তাঁর বর্ণনায় বহু মুনকার হাদীস রয়েছে। মুনকার যয়ীফ হাদীসেরই একটি প্রকার। তবে তা এতটাই দুর্বল যে, এর দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা বিধিত নয়। বিস্তারিত জানতে দেখা যেতে পারে, তাহযীবুল কামাল ১৪/৫৩৩, আল-কামিল, ইবনে আদী ৬/৪৩৬, আয-যুআফাউল কাবীর, উকাইলী ৩/৩৮৩; ইতহাফুল মাহারাহ বি আতরাফিল আশারাহ, ইবনে হাজার আসকালানী ৩/৩০৯। যদিও হাদীসটিকে শায়খ আলাবানী রাহ. হাসান বলে অভিহিত করতে দ্বিধা করেননি। অথচ তিনি অসংখ্য সহীহ হাদীসকেও মওযু বা যয়ীফ বলতেও কার্পণ্য করেননি!
তাছাড়া হাদীসটিতে বলা হয়েছে, এটি রমাযানের এক রাতের ঘটনা। আর সে সময় জামাতবদ্ধ তারাবীহ এর ব্যাপক প্রচলন ছিল না। সে হিসেবে বর্ণনাটি সহীহ ধরে নেয়া হলেও একথা বলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, অবশিষ্ট রাকাআতগুলো একাকি পড়ে নেয়া হয়েছে। আর এটা নিছক কোনো অনুমান বা সম্ভাবনা নয়; সহীহ মুসলিমে এধরনের একটি বর্ণনা রয়েছে। বর্ণনাটিতে বলা হয়েছে, আনাস রা. বলেন, রমাযানের এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়ছিলেন। আমি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে দাঁড়িয়ে যাই। এরপর আরেকজন আসে। সে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। এরপর আরেকজন আসে। এভাবে একটি জামাতে পরিণত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অনুধাবন করতে পারলেন, আমরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছি তখন নমাজকে সংক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর নিজ গৃহে গিয়ে আরো কিছু নামায পড়লেন যা আমাদের কাছে পড়েননি। ভোর হলে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, গত রাতে কি আমাদের উপস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন? ওাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যা। এবং তোমাদের এব্যাপারটিই আমাকে আমার কৃত কার্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। সহীহ মুসলিম ৩/১৩৪/২৬২৫
হাদীসটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘এরপর নিজ গৃহে গিয়ে আরো কিছু নামায পড়লেন যা আমাদের নিকট পড়েননি।’
সার কথা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অস্পষ্ট বক্তব্য সম্বলিত একটি মুনকার ও অতি দুর্বল বর্ণনাকে উপরোক্ত অকাট্য দলীলসমৃদ্ধ এবং সর্বসম্মত একটি বক্তব্যের বিপক্ষে দাঁড় করানো আদৌ যথার্থ নয়। উপরন্তু যদি হাদীসটি সহীহ হতো এবং এর দ্বারা আট রাকাআত তারাবীহ প্রমাণিত হতো তাহলে হযরত জাবের রা.ই তো সর্বপ্রথম বিশ রাকাতের বিপক্ষে এই হাদীসটি উপস্থাপন করতেন।

৩. আট রাকাআত তারাবীহ বিষয়ে তৃতীয় যে বর্ণনাটি উপস্থাপন করা হয় তাও সে ইসা বিন জারিয়া রা. এর বর্ণনা। তিনি উবাই বিন কা‘ব রা. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন। নিতান্ত একজন দুর্বল বর্ণনা কারীর বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা আদৌ সমীচীন নয়। তদুপরি এটি যে একটি তারাবীহ সংক্রান্ত হাদীস তারও কোনো প্রামাণিক ভিত্তি নেই। আর ঘটনা কাল রমাযান মাস কি না তাও সন্দেহপূর্ণ। বিস্তারিত জানতে অধ্যয়ন করা যেতে পারে হাবীবুর রহমান আ‘জমী রহ. রচিত রাকাআতে তারাবীহ ৪০। তাছাড়া যদি বর্ণনাটি সহীহ হতো এবং তাতে তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যা উল্লেখ থাকত তাহলে উবাই বিন কা‘ব রা. যখন তারাবীহ এর ইমাম হলেন তখন আট রাকাতই পড়াতেন; বিশ রাকাআত পড়াতেন না।

৪. আট রাকাআত তারাবীহ বিষয়ে চতুর্থ যে বর্ণনাটি উপস্থাপন করা হয় তাও একটি ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনা। একজন বর্ণনাকারী উমর রা. এর যুগের নামাযের বিবরণ দিতে গিয়ে ভুলক্রমে বিশ এর স্থলে এগারো রাকাআত উল্লেখ করেন। অথচ উমর রা. এর যুগে তারাবীহ এর নামায যে বিশ রাকাআত হতো এতে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ.সহ অনেক বিদগ্ধ আলেম বিশের স্থলে এগারো উল্লেখ করাকে বর্ণনাকারীর ভুল বলে অভিহিত করেছেন।- আল-ইসতিযকার ৫/১৫৭, রাকাআতে তারাবীহ ১২।

আট রাকাতের পক্ষে আমাদের ভাইদের সবচেয়ে শক্তিশালী (?) যুক্তিঅস্ত্র হলো, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই নামায। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, তারা আট রাকাতের সপক্ষে শক্তিশালী কোনো দলীল না পেয়েই এই যু্িক্তর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। নতুবা এটা ঢোপে টেকার মত কোনো যুক্তি নয়। কারণ এ যে তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদকে একাকার করে দেখানো হচ্ছে এর সপক্ষে কি কোনো হাদীস আছে? সাহাবী উক্তি? কিংবা তাবিয়ী উক্তি? অন্য কোনো মাসে শেষ নিশিথে দাঁড়িয়ে কেউ কি কোনো কালে বলেছে আমি তারাবীহ পড়ছি। রামাযান মাসে ঈশার নামাযের পরে তারাবীহতে দাঁড়িয়ে কেউ কি বলছে আমি তাহাজ্জুদ পড়ছি। দুটি নামায এক হলে একথা কেউ বলেননি কেন? বাধা কোথায়? প্রশ্ন হতে পারে একটি বিষয়ের দুটি নাম হতে পারে। উত্তরে আমরাও বলি একটি বিষয়ের দুটি নাম হতে পারে; বরং দুটি কেন একাধিক নামও হতে পারে। তবে তার জন্য শর্ত হলো যে কোনো নামে যখন তখন সম্বোধন করা বিধিত থাকতে হবে। এক সময় এক নাম অন্য সময় ভিন্ন নাম এমনটি হলে এটা সে বিষয়ের একাধিক নাম হলো না। তাহাজ্জুদের জায়গায় তারাবীহ, তারাবীহের জায়গায় তাহাজ্জুদ বলার বৈধতা এবং অনুমোদন থাকলেই কেবল বলা যাবে দুটো একই বিষয়। এবার আমরা তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ শব্দ দুটির আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ করি। অভিধান এবং পরিভাষা এদুটো নামাযকে একই নামায হিসেবে অভিহিত করে কি না?

নিচে বিখ্যাত কিছু আরবী অভিধান গ্রন্থের বক্তব্য তুলে ধরা হলো,
তাহাজ্জুদ :
১. তাহাজ্জুদ অর্থ রাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করা। তাহাজ্জুদ শব্দটি স্ববিরোধী অর্থবহ একটি শব্দ। (অর্থাৎ শব্দটি একই সাথে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার অর্থ প্রদান করে।) আলমুনাবী, আত্তাউকীফ আলা মুহিম্মাতিত তাআরিফ ১/২১১
২. তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। ইসমাইল বিন হাম্মাদ আলজাউহারী, আসসিহাহ ফিললুগাহ ২/২৪৩
৩. তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে ঘুমানোর পর জাগ্রত হওয়া। ড. জাউয়াদ আলী, আলমুফাসসাল ফি তারিখিল আরব ১২/৪২৪
৪. وتَهَجَّدَ القوم استيقظوا للصلاة তাহাজ্জাদাল কাউমু অর্থ মানুষ নামাযের জন্য জাগ্রত হয়েছে।Ñ ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব ৩/৪৩১
৫. তাহাজ্জুদ অর্থ : রাতে নিদ্রা যাওয়া, নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়া। সালাতুত তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নফল নামায আদায় করা।
صلاة التهجد: التنفل بعد النوم…ঝঢ়বহফ ঃযব হরমযঃ রহ ঢ়ৎধুবৎ
মুহাম্মদ কালআজী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১৮১

তারাবীহ :
১. তারাবীহ অর্থ : রমাযান মাসে দশ সালামে বিশ রাকাত নামায আদায় করা। তারাবীহকে তারাবীহ বলে নাম করণের কারণ হলো, মানুষ তারাবীহ নামাযের ভিতরে প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর বসে এবং বিশ্রাম গ্রহণ করে। (তারাবীহ এটা আরবী তারবীহাহ এর বহুবচন। তারবীহাহ অর্থ বিশ্রাম গ্রহণ করা।) মুহাম্মদ বিন আবুল ফাতহ আলহাম্বলী, আলমাতলা’ আলা আবওয়াবিল ফিকহ ১/৯৫
২. ‘আমি তাদের নিয়ে তারাবীহ নামায আদায় করেছি’ এখানে তারাবীহ শব্দটি তারবীহাহ এর বহুবচন। আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর মুসল্লীরা বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে বলে তারবীহাহকে তারবীহাহ বলা হয়। আল্লামা মুতাররিযী, আলমুগরিব ২/৪০৯
৩. তারাবীহকে তারাবীহ নামে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে। মুরতাযা আযযাবিদী, তাজুল আরুস ১/১৬০৪
৪. তারাবীহ এর একবচন হলো, তারবিহাহ। অর্থ, বিশ্রাম গ্রহণ করা জবপৎবধঃরড়হ । তারাবীহকে তারাবীহ নামে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাত অন্তর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকে। ঞযব ষড়হম ঢ়ৎধুবৎং রহ হরমযঃং ড়ভ জধসধফধহ মুহাম্মদ কালআজী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১২৭
৫. সালাতুত তারাবীহ অর্থ, রমাযান মাসে রাতে ঈশার নামাযের পর বিশ রাকাত নামায আদায় করা। অ ঢ়ৎধুবৎ ঢ়বৎভড়ৎসবফ ফঁৎরহম ঃযব হরমযঃং ড়ভ জধসধফধহ
মুহাম্মদ কালআজী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ১/১৭৫

উপরোক্ত অভিধানগুলোতে তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ এর স্পষ্ট সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে কোথাও তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহকে একাকার করে দেখানো হয়নি। উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, তাহাজ্জুদের ধাতুগত অর্থই হলো, ঘুমানো বা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। এতে প্রতীয়মান হয়, তাহাজ্জুদের ব্যাপারটি ঘুমোত্তর সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট।

তাহাজ্জুদের বিষয়টি সরাসরি পবিত্র কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামায আদয় করবে। এটা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।’ সূরা বানী ইসরাইল ৭৮
এবার লক্ষ করা যাক, মহান মুফাসসিরীনে কেরাম তথা কুরআন বিশেষজ্ঞগণ উপরোল্লিখত আয়াতস্থিত তাহাজ্জুদের কি ব্যাখ্যা করেছেন।

১. তাহাজ্জুদের ব্যাপারে তিনটি উক্তি রয়েছে। ১. নিদ্রা যাওয়া এরপর নামায আদয় করা এরপর আবার নিদ্রা যাওয়া এরপর আবার নামজ পড়া। ২. ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা ৩. ঈশার নামাযের পর নামায আদায় করা। এগুলো হলো তাবিয়ীনে কেরামের বিভিন্ন উক্তি। সম্ভবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু ঘুমাতেন এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায পড়তেন এরপর আবার ঘুমাতেন এরপর আবার নামায আদায় করতেন তাই তাবিয়ীনে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামাযের এ পদ্ধতির অনুসরণে ঘুমোত্তর নামাযকে তাহাজ্জুদ বলে অভিহিত করেছেন। যদি ব্যাপারটি একারণেই হয়ে থাকে তাহলে এটিই ঘনিষ্ঠ এবং যথোপযুক্ত অভিমত। ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ৫/২৮৬

২. হাজ্জাজ বিন আমর আনসারী রা. বলেন, তোমাদের অনেকে ধারনা করে, শেষ রাত অবধি নামায পড়া হলেই তা তাহাজ্জুদ নামায হয়ে গেল। না ব্যাপারটি এমন নয়। বরং তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে তারপর নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাহাজ্জুদ নামায এমনি ছিল। আসওয়াদ এবং আলকামা রা. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করার নাম।- মু’জামে কাবীর তাবারানী, হাদীস ৩২১৬, মাজামাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ৩৬১৬, হাইসামী রা. এর সনদ সহীহ এবং এ সনদের বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী।, আবু বাকার জাসসাস, আহকামুল কুরআন ৫/৩২

৩. তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। এখন এটা একটি নামাযের নাম হয়ে গেছে। কারণ এ নামাযের জন্য জাগ্রত হতে হয়। সুতরাং তাহাজ্জুদ নামাযের পারিভাষিক অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। আসওয়াদ, আলকামাহ এবং আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ রাহ. তাহাজ্জুদের এ অর্থই করেছেন। এরপর কুরতুবী রাহ. হাজ্জাজ বিন আমরের হাদীসটি উল্লেখ করেন। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, রাতের একটা সময় নামাযের জন্য জাগ্রত হও। ইমাম কুরতুবী, আলজামি’ লিআকামিল কুরআন ১০/৩০৮

৪. ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির এবং মুহাম্মদ বিন নাসর আলকামা এবং আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণনা করেন, তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা।- ইমাম সুয়ূতী রাহ., আদদুররুল মানসূর ৯/৭৬

৫. আয়াতটির অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হও এবং নামায আদায় করো। মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া ব্যতীত তাহাজ্জুদের নামায হয় না। জনৈক আনসার সাহাবী সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক সফরে ছিলেন। তখন সে বলল, আজ আমি দেখবো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালেন। এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। এরপর মস্তক মোবারক আকাশ পানে উত্তোলন করলেন, এরপর সূরা আলে ইমরানের চারটি আয়াত পাঠ করলেন। এরপর হাত দ্বারা কোনো ইবাদত করার ইচ্ছা করলেন এবং একটি মিসওয়াক হাতে নিলেন। এরপর তার দ্বারা দাঁত মাজলেন। এরপর উযু করলেন এরপর নামায পড়লেন। এরপর ঘুমালেন। এরপর আবার জাগ্রত হলেন এবং পূর্বোক্ত কাজগুলো আবার করলেন। উলামায়ে কেরাম মনে করেন এই নামাযই সেই তাহাজ্জুদের নামায যে নামায সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন।-সুনানে নাসয়ী কুবরা, হাদীস ১০১৩৯, আবু ইসহাক নিশাপুরী, আলকাশফু ওয়াল বায়ান ৬/১২৩

৬. আয়াতটির অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আপনি নামাযের জন্য দ-ায়মান হোন। আর তাহাজ্জুদ অর্থ হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা।-আবুল লাইস সামারকান্দী, বাহরুল উলূম ৩/২৩

৭. তাহাজ্জুদ ঐ নামাযকে বলা হয় যা ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করা হয়। আলকামা, আসওয়াদ, ইবরাহীম রাখায়ী প্রমুখ তাহাজ্জুদের এ অর্থ করেছেন। আরবী ভাষায় তাহাজ্জুদের এ অর্থটিই প্রশিদ্ধ। তেমনিভাবে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন। ইবনে আব্বাস, আয়িশা রা.সহ অন্যান্য সাহাবী থেকে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। যেমনটি যথাস্থানে সুবিস্তর আলোচিত হয়েছে। যাবতীয় প্রশংসা এবং অনুগ্রহ আল্লাহ তা’আলার জন্য। তবে হাসান বসরী রা. বলেন, তাহাজ্জুদ ঐ নামায যা ঈশার নামাযের পর আদায় করা হয়। তার একথার মর্মার্থ হবে, ঈশার নামাযের পর ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যে নামায আদায় করা হয় তাই তাহাজ্জুদের নামায। তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/১৫০

৮. অধিকাংশ মুফাসসিরীনে কেরামের মতে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া ব্যতীত তাহাজ্জুদ নামায হয় না।-তাফসীরুল আ’কাম ১/৩৭২

৯. আয়াতটির অর্থ হলো, তুমি রাতের কিছু সময় নামাযের জন্য জাগ্রত হও। আলকামা রা.সহ অন্যান্য তাবিয়ীগণ বলেন, তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করার নামায। হাসান বসরী রা. বলেন, ঈশার শেষ সময়ের পরে যে নামায আদায় করা হয় তাই তাহাজ্জুদ।-আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ সা‘আলাবী, জাওয়াহিরুল হিসান ২/৩৫৫

১০. আয়াতটির অর্থ তুমি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাযের জন্য দাঁড়াও। তাহাজ্জুদ অর্থই হলো, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা।-আলাউদ্দীন আলবাগদাদী, তাফসীরুল খাযিন ৪/১৭৪

১১. আল্লামা আযহারী রাহ. বলেন, আরবী ভাষায় প্রশিদ্ধ হলো, সেখানে ঘুমন্ত ব্যক্তিকে হাজিদ বলা হয়। এরপর আমরা দেখলাম, শরয়ী পরিভাষায় যে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করে তাকে ‘মুতাহাজ্জিদ’ বলা হয়। সুতরাং এখন একথা মেনে নেয়া আবশ্যক হয়ে গেল যে, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায়কারী ব্যক্তিকে মুতাহাজ্জিদ করে নাম করণ করা হয়েছে নিজের ঘুমকে দূরীভুত করার কারণে। আমি বলি, এখানে আরো একটি সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা হলো, মানুষ সাধের ঘুমকে পরিত্যাগ করে এবং নামাযের জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার কষ্টকে স্বীকার করে নেয় যাতে সে মৃত্যুকালীন ঘুমকে আনন্দময় করে তুলতে পারে। সুতরাং এই ঘুম পরিত্যাগের মূল উদ্দেশ্য যেহেতু মৃত্যুকালীন স্বাচ্ছন্দ্যময় নিদ্রা জীবন লাভ করা তাই গভীর রাত্রের এই বিনিদ্র নামাযকে তাহাজ্জুদ করে নাম করণ করা হয়েছে। এখানে তাহাজ্জুদ নাম করণের তৃতীয় আরো একটি কারণ রয়েছে। আর তা হলো, হাজ্জাজ বিন আমর আনসারী রা. বলেন, তোমাদের অনেকে ধারনা করে, শেষ রাত অবধি নামায পড়া হলেই তা তাহাজ্জুদ নামায হয়ে গেল। না ব্যাপারটি এমন নয়। বরং তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে তারপর নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাহাজ্জুদ নামায এমনি ছিল।-তাফসীরে রাযী ১০/১০৮

১২. তাহাজ্জুদকে তাহাজ্জুদ বলে নাম করণ করা হয়েছে। কারণ এর মূল বিষয়টি হলো, ঘুমিয়ে যাওয়া এরপর জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা এরপর আবার ঘুমিয়ে যাওয়া এরপর আবার জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। সুতরাং তাহাজ্জুদ অর্থ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা। যেমনটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং দাউদ আলাইহিস সালাম এর নামায। আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলার নিকট সবচে প্রিয় রোযা দাউদ আ. এর রোযা এবং আল্লাহ তা‘লার নিকট প্রিয় নামায হলো, দাউদ আ. এর নামায। দাউদ আ. অর্ধ রাত্রি ঘুমাতেন এবং এক তৃতীয়াংশ রাত্রি নামায পড়তেন এরপর এক ষষ্ঠমাংশ রাত্রি ঘুমাতেন। আর তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন রোযাবিহীন থাকতেন। সাহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৯৬, নিযামুদ্দীন নিশাপুরী, তাফসীরু গারাইবিল কুরআন ৮/১৯৭

১৩. আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে বলেন, আপনি রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে কুরআনের মাধ্যমে নামায আদায় করুন। আর তাহাজ্জুদ অর্থ রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া। হাজ্জাজ বিন আমর, আলকামা, আলআসওয়াদ, আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ রা. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আদায় করার নামায। হাসান বসরী রা. বলেন, তাহাজ্জুদ হলো, ঈশার শেষ সময়ের পর আদায় করা নামায। জনৈক আনসার সাহাবী সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক সফরে ছিলেন। তখন সে বলল, আজ আমি দেখবো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালেন। এরপর ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। এরপর মস্তক মোবারক আকাশ পানে উত্তোলন করলেন, এরপর সূরা আলে ইমরানের চারটি আয়াত পাঠ করলেন। এরপর হাত দ্বারা কোনো ইবাদত করার ইচ্ছা করলেন এবং একটি মিসওয়াক হাতে নিলেন। এরপর তার দ্বারা দাঁত মাজলেন। এরপর উযু করলেন এরপর নামায পড়লেন। এরপর ঘুমালেন। এরপর আবার জাগ্রত হলেন এবং পূর্বোক্ত কাজগুলো আবার করলেন। উলামায়ে কেরাম মনে করেন এই নামাযই সেই তাহাজ্জুদের নামায যে নামায সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন।-আবু জা’ফর তাবারী, জামিউল বায়ান ৯/২৪৫-২৪৬

১৪. আয়াতটির অর্থ আপনি রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামায এবং কুরআন পাঠের মাধ্যমে আপনার প্রভুর উদ্দেশে তাহাজ্জুদ নামায আদায়কারী হোন।-মুহাম্মদ সাবুনী, সফওয়াতুত তাফাসীর ২/১৩৮

১৫. প্রথম রাত্রে ঘুমিয়ে এরপর জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করা হলো তাহাজ্জুদের নামায। সাইয়িদ কুতুব শহীদ, ফি জিলালি কুরআন ৬৫/৫৫

তাহাজ্জুদের সময় সীমা সম্বন্ধে কয়েকটি হাদীসের বর্ণনা

১. আসওয়াদ রা. বলেন, আমি আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাতের বেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায কেমন ছিল। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম রাত্রে ঘুমাতেন এবং শেষ রাত্রে নামায আদায় করতেন। এরপর বিছানায় ফিরে আসতেন। যখন মুয়াজ্জিন আযান দিতো তখন দ্রুত উঠে যেতেন। যদি প্রয়োজন হতো তবে গোসল করে নিতেন। নতুবা উযু করে মসজিদে চলে যেতেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৪৬

২. ফরজ নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো গভীর রজনীর নামায। মু’জামে তাবারানী কাবীর, হাদীস ১৬৯৫

৩. মাসরুক রা. বলেন, আমি আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে কখন নামায আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, যখন গভীর রজনীতে মোরগের ডাক শুনতেন তখন নামায আদায় করতেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৩২

৪. রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোলাম সাওবান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে কোনো এক সফরে ছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ সফরটি কষ্ট এবং দুর্দশার সফর। তোমাদের কেউ যখন বিতর নামায পড়বে তখন যেন সাথে আরো দুই রাকাত পড়ে নেয়। যদি জাগ্রত হয় তবে তো ভাল কথা। নতুবা সে দুই রাকাতই তার জন্য তাহাজ্জুদ হিসেবে গণ্য হবে।- সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১১০৬
হাদীসটির ব্যাখ্যায় আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. বলেন, এ দু রাকাত নামায হলো, ঘুমপূর্ব তাহাজ্জুদ। এটা তাহাজ্জুদ সংক্রান্ত উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের বিপররীত কোনো বক্তব্য নয়। কারণ এটা প্রকৃত অর্থে তাহাজ্জুদ নয়; রূপক অর্থে তাহাজ্জুদ।-আনওয়ার শাহ আলকাশমিরী, ফাইযুল বারী শরহু সহীহিল বুখারী ৪/১

তারাবীহ নামাযের সময় সীমা

১. তারাবীহ নামাযের সময় হলো ঈশার নামাযের পর থেকে নিয়ে শেষ রাত পর্যন্ত। কারণ তারাবীহ নামায ঈশার নামাযের অনুগামী। বিতর নামায অনুগামী নয়। সুতরাং যদি অপবিত্রাবস্থায় ঈশার নামায আদায় করা হয় আর তারাবীহ নামায পবিত্রাবস্থায় আদায় করা হয় তাহলে ঈশার নামাযের সাথে সাথে তারাবীহ নামাযকেও দ্বিতীয়বার পড়তে হবে। বিতর দ্বিতীয়বার পড়তে হবে না।-আব্দুর রাহমান শাইখযাদাহ, মাজমাউল আনহুর ফি শারহি মুলতাকাল আবহুর ১/২০২

২. তারাবীহ নামাযের সময় হলো, ঈশার নামাযের পর থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। বিতর নামাযের পূর্বেও হতে পারে পরেও হতে পারে। কারণ তারাবীহ নামায হলো, নফল নামায যা ঈশার নামাযের পর সুন্নাত হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে। এবং এটাই সর্বাধিক সঠিক অভিমত।-খাসরু বিন কারামুয রুমী (৮৮৫ হি. ১৪৮০ খৃ.), দুরারুল হুক্কাম শারহু গুরারিল আহকাম ১/২৩৩

৩. তারাবীহ নামাযের সময় হলো ঈশার নামাযের পর থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বিতরের পূর্বে এবং পরে।-মুহাম্মদ বিন আবু বাকার রাযী, তুহফাতুল মুলূক ১/৮১

৪. ঈশার নামায সম্পন্ন করার পরই তারাবীহ নামাযের সময় আরম্ভ হয়।-আব্দুল কারীম রাফিয়ী, ফাতহুল আযীয ফি শারহিল ওয়াজীয ৭/১৫৯

৫. অধিকাংশ মাশায়েখে কেরামের অভিমত অনুসারে তারাবীহ নামাযের সময় হলো, ঈশা এবং সুবহে সাদিকের মধ্যবর্তী সময়। কেউ ঈশার নামাযের পূর্বে তারাবীহ পড়ে তাহলে তারাবীহ নামায হবে না। তবে যদি বিতর নামাযের পরে পড়ে তাহলে আদায় হবে। কারণ তারাবীহ নামায হলো নফল নামায যা ঈশার নামাযের পর সুন্নত হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে। সুতরাং তারাবীহ নামাযটি অন্যান্য মাসের ঈশার নামায পরবর্তী সুন্নত নামাযের সাথে সদৃশ্যপূর্ণ।-বুরহানুদ্দীন মাহমুদ বিন আহমদ, আলমুহীতুল বুরহানী ২/১৮৪

৬. বিশুদ্ধ মত হলো, তারাবীহ নামাযের সময় হলো ঈশার নামাযের পর থেকে নিয়ে শেষ রাত পর্যন্ত বিতর নামাযের পূর্বে এবং পরে। কারণ তারাবীহ নামায হলো নফল নামায যা ঈশার নামাযের পর সুন্নত হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছে। হিদায়াতে এমনটিই রয়েছে।-আবু বাকার ইবনে আলী যাবিদী, আলজাউহারাতুন নাইয়িরাহ ১/৩৯০

৭. রমাযান মাসে তারাবীহ এবং বিতর নামাযের সময় : রমাযান মাসে ঈশার নামাযের পর বিতরের সাথে তারাবীহ নামাযটি আদায় করা হয়। অর্থাৎ ইমাম সাহেব মুসল্লীদের নিয়ে নামায আদায় করেন এবং বিতর নামায পড়েন। এ কারণে তারাবীহতে বিতর পড়া হয়।-মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ শানকিতী, শারহু যাদিল মুস্তানকি’ ৩/৪৭

৮. বিতর এবং তারাবীহের সময় হলো, ফজর নামাযের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। কারণ পরবর্তীগণ পূর্ববর্তীগণ থেকে এমনটিই বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ রাহ.সহ অন্যান্য ইমামগণ বর্ণনা করেন, আল্লাহ একটি নামায দান করেছেন যা তোমাদের জন্য লাল উট থেকেও উত্তম। আর তা হলো বিতরের নামায। ঈশা থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত তোমাদের জন্য সময় সীমা বেধে দিয়েছেন। মাহামিলী রাহ. বলেন, বিতরের নামাযের উৎকৃষ্ট সময় হলো, মধ্য রাত্রি অবধি। কাযী আবুত তাইয়িব প্রমুখ বলেন, মধ্য রাত্রি অথবা রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। আর তারাবীহের উৎকৃষ্ট সময় তাই যা বিতরের সময় হিসেবে বলা হলো। যাকারিয়া আলআনসারী, আসনাল মাতালিব ৩/২০৩

৯. ইশার নামায শেষ হওয়ার পর তারাবীহ নামাযের সময় প্রবেশ করে। ইমাম বাগাবী রা. প্রমুখ উল্লেখ করেছেন, তা সুবহে সাদিক পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে।-ইমাম নববী, কিতাবুল মাজমু’ ৪/৩২

১০. তারাবীহ নামাযের সময় ঈশার নামাযের সুন্নতের পর বিতরের পূর্বে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত। সুতরাং ঈশার নামাযের আগে তারাবীহ নামায হবে না। যে ব্যক্তি ঈশার নামায পড়ে তারাবীহ পড়ল অতঃপর জানা গেল সে বিনা উযুতে ঈশার নামায পড়েছে তাহলে সে তারাবীহকে পুনরায় পড়বে। কারণ তারাবীহ নামায হলো, সুন্নাত নামায যা ফরজ নামাযের পর প্রবর্তন করা হয়েছে। সতুরাং তারাবীহ নামায ঈশার সুন্নতের মত ফরজের পূর্বে শুদ্ধ হবে না।-ওয়াহবাহ যুহাইলী, আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু ২/২৫৩

ইবনে হাজর হাইতামী রাহ. কে প্রশ্ন করা হলো, ইমাম হালিমী থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, ‘তারাবীহ নামাযের ব্যাপারে শরীয়তের বিধান হলো, তা রাতের এক চতুর্থাংশ অতিক্রম করার পর আদায় করবে। আর ঈশার পর শুরু সময়ে তারবীহ নামায আদায় করা অলস এবং সৌখিন প্রকৃতির লোকদের নব উদ্ভাবিত একটি পন্থা। এটা কোনো সুন্নাহসম্মত নামায নয়। সুন্নাহসম্মত নামায হলো ঐ নামায যা ঘুমের সময় আদায় করা হয়। আর যে ব্যক্তি রাতের শুরু ভাগে তারাবীহ নামায আদায় করল সে অন্য সমস্ত নফল আদায়কারীর মত সাব্যস্ত হবে।’ তো ইমাম হালিমী রাহ. তারাবীহ বিষয়ে যা বললেন তা অন্যান্য ইমামের বক্তব্যের সমর্থক কি না? এবং তা কি নির্ভরযোগ্য? এবং তার বক্তব্য মতে যে ব্যক্তি রাতের শুরু ভাগে তারাবীহ নামাযের জামাত পেল তার জন্য কি জামাতের সওয়াব লাভের আশায় তখন তারাবীহ পড়া উত্তম হবে না কি সুন্নাহসম্মতভাবে পড়ার জন্য বিলম্বে পড়া উত্তম হবে?
উত্তরে তিনি বললেন, মাসআলাটি ‘শরহুল উবাব’ গন্থে আলোচিত হয়েছে। শরহুল উবাবের ভাষ্য হলো, ‘তারাবীহ নামাযের উৎকৃষ্ট সময়ের ব্যাপারে ইমাম হালিমী বলেন, রাতের প্রথম এক চতুর্থাংশ অতিক্রম করার পর তারাবীহ নামাযের সময় শুরু হয়। কারণ সাহাবায়ে কেরাম উমর রা. এর শাসন আমলে এ সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটাতেন এবং পরবর্তী দুই চতুর্থাংশে নামায পড়তেন এবং রাতের চতুর্থাংশে সাহরী এবং অন্যন্য প্রয়োজনীয় কাজে আত্মনিয়োগ করতেন। আর ঈশার পর শুরু সময়ে তারবীহ নামায আদায় করা অলস এবং সৌখিন প্রকৃতির লোকদের নব উদ্ভাবিত একটি বিষয়। এটা কোনো সুন্নাহসম্মত নামায নয়। কারণ এ নামাযকে ‘কিয়ামুল লাইল’ (রাত্রিকালীন দাঁড়িয়ে পড়া নামায) বলে নাম করণ করা হয়েছে বিছানা থেকে উঠে বা দাঁড়িয়ে গিয়ে নামায আদায় করার কারণে। সুতরাং রাত্রের শুরু ভাগে তারাবীহ আদায়কারী রাতে অথবা দিনে অন্য নফল নামায আদায় কারীর মত হবে।’ তাঁর এ বক্তব্যে ঘোর আপত্তি রয়েছে। সহীহ বুখারীর বর্ণনা দ্বারা এ বক্তব্য ভ-ুল হয়ে যায়। সহীহ বুখারীতে রয়েছে, উমর রা. এর শাসন আমলে উবাই রা. সাহাবীদের নিয়ে তারাবীহ পড়েছেন তারা ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্বে। এতে ইমাম হালিমীর বক্তব্যের বিপরীত মত যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়। তারাবীহ নামাযের উৎকৃষ্ট প্রথম সময় হলো তাই যা বিতরের উৎকৃষ্ট সময়। আর তা হলো রাতের এক তৃতীয়াংশ সময়। এ সময় সীমা ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা পোষণ করে না। তবে যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা পোষণ করে তার জন্য উত্তম হলো বিতর এবং তারাবীহ নামায ঘুম থেকে উঠে আদায় করা। সার কথা হলো, যে ব্যক্তি তারাবীহ অথবা বিতর ঘুমের পূর্বে পড়তে চায় তার জন্য উৎকৃষ্ট সময় হলো রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। আর যে ব্যক্তি কোনো একটি ঘুমের পর পড়তে চায় তাহলে তার জন্য উত্তম হলো, বিতরকে শেষ রাত্রে পড়া আর তারাবীহকে ঘুমের পূর্বে পড়া। ইমাম হালিমী রাহ. এর বক্তব্যের ভাবার্থ এমনটিই গ্রহণ করা হবে। কারণ তুমি জেনেছো, তিনি তার বক্তব্যের মানদ- বানিয়েছেন সাহাবায়ে কেরামের কর্মদ্ধতিকে যে সাহাবায়ে কেরাম রাতের প্রথম এক চতুর্থাংশ ঘুমাতেন। এরপর দুই চতুর্থাংশ নামায পড়তেন। আর সহীহ বুখারীতে যে বর্ণনা রয়েছে তা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা ঘুমের আগেই নামায পড়ত। এতে হালিমী রাহ. এর বক্তব্য খ-ন হয়ে যায়। তাছাড়া তার বক্তব্য অন্যান্য ইমামের বক্তব্যেরও বিপরীত। কারণ শাফিয়ী মাসলাকের ইমামগণ সময় বিবেচনায় তারাবীহ নামাযকে ঈশার নামাযের সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন। আর এর বাহ্যিক অর্থ হলো, তারাবীহ নামাযকে শুরু সময়ে পড়া উত্তম। হালিমী রাহ. অন্যান্য ইমামদের বিপরীত মত গ্রহণ করেছেন। কারণ তার ধারনা মতে, তিনি সাহাবায়ে কেরাম সম্বন্ধে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা সত্য এবং যথার্থ। এ বর্ণনা যে শুদ্ধ নয় তা পূবের্ই স্পষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং পূর্বে যে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে তাই যথার্থ। আর যদি শরুতে জামাতের সাথে তারাবীহ পড়া আর শেষ রাতে বিনা জামাতে তারাবীহ পড়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাহলে জামাতের সাথে প্রথম রাত্রে তারাবীহ পড়াই উত্তম যদি জামাতের যাবতীয় বিধি ও শর্ত রক্ষা করা হয়। ইমাম ইবনে হাজর হাইতামী, আলফাতাওয়া আলকুবরা আলফিকহিয়্যাহ আলা মাযহাবিল ইমাম আশশাফিয়ী ২/৪৬-৪৭

উমর রা. বললেন, এটা অর্থাৎ তারাবীহ এর বড় জামাত কত সুন্দর নতুন একটি বিষয়। উমর রা. বলেননি, তারাবীহ নামায কত সুন্দর নতুন একটি বিষয়। কারণ তারাবীহ নামায যে সুন্নত তাতো মৌলিকভাবে প্রমাণিত।- মোল্লা আলী আলকারী আলহারাবী, মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ ৪/৪৩৪

কিছু ভাই তাহাজ্জুদ সংক্রান্ত সহীহ বুখারীর একটি হাদীসের অযথার্থ ব্যাখ্যা করে তা তারাবীহ এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেন। এবং বলেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই নামাযের দুই নাম। যে নামায সারা বছর তাহাজ্জুদ হিসেবে গণ্য হয় তাই শুধু রমাযান মাসে এসে তারাবীহতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। যখণ তাঁদেরকে বলা হয়, ভাই! তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ একই নামায বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণ করে দেখান। তখন তারা হাদীসের পথে না গিয়ে আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রা. কে তুলে ধরেন। আমরা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রা. এর পূর্ণ বক্তব্যটিকে উদ্ধৃত করে সে ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চেষ্টা করবো। আনওয়ার কাশ্মীরী রা. বলেন, ‘ব্যাপকভাবে উলামায়ে কেরাম বলে থাকেন, তারাবীহ এবং সালাতুললাইল ভিন্ন শ্রেণীর দুটি নামায। আমার মতে এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কথা হলো, এ দুটি একই নামায। যদিও দুটির মাঝে বৈশিষ্টগত ব্যাবধান রয়েছে। যেমন তারাবীহকে নিয়মতান্ত্রিক ধারাবাহিকভাবে পড়া হয় এবং জামাতসহ আদায় করা হয় এবং কখনো শুরু রাত্রে পড়া হয় আবার কখনো সাহরীর সময় পর্যন্ত পড়া হয়। তাহাজ্জুদ এসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ তাহাজ্জুদ শেষ রাতে পড়া হয় এবং তাতে কোনো জামাত হয় না। আর বৈশিষ্টগত ব্যবধানের কারণে দুটি নামাযকে আলাদা দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা আমার নিকট পছন্দনীয় নয়। এ দুটি নামায মূলত একই নামায। শুরু রাত্রে পড়া হলে তা তারাবীহ হয় আর শেষ রাতে পড়া হলে তা তাহাজ্জুদ নামায হয়ে যায়। আর বৈশিষ্টগত ব্যবধানের কারণে ভিন্ন নামে নাম করণ করা কোনো নতুন বিষয় নয়। কারণ উম্মাহর ঐকমত্য হলে নামের ভিন্নতায় কোনো সমস্যা নেই।’ -আনওয়া শাহ আলকাশমিরী, ফাইযুল বারী ৪/২৩, ২৪

কাশ্মিরী রাহ. এখানে যে ধারনাটি দেয়ার চেষ্টা করেছেন তা হয়তো তাঁর নিজস্ব বিবেচনায় যথার্থ এবং যৌক্তিক ছিল। কিন্তু আমাদের ক্ষুদ্র বিবেচনায় এখানে ভিন্নমত পোষণের যথেষ্ট অবকাশ এবং উপাদান রয়েছে। কারণ সত্তাগত সব রকমের নামাযই এক ও অভিন্ন। পদ্ধতিগতভাবে কোনো নামাযের মাঝে ব্যবধান তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই। কিয়াম, রুকু, সিজদা, কিরাত, জালসা নামাযের এসব মৌলিক দিক বিবেচনায় সব নামাযই এক। সময় কিংবা জামাতের বিবেচনায় নামাযগুলো ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীভুক্ত হয়ে যায়। একই নামায দুপুরে পড়লে যোহর হয়ে যায় এবং সূর্যোদয়ের দেড় দুই ঘন্টা পর পড়লে তা ঈশা হয়ে যায়। অথচ এ দুটি নামাযের মাঝে কোনো রকমের ব্যবধান নেই। এমনকি দুটি নামাযের রাকাআত সংখ্যাও এক ও অভিন্ন। তাহলে কি আমাদের জন্য একথা বলার সুযোগ আছে যে এ দুটি একই নামাযের দুই নাম? এখানে তো ব্যবধান শুধু সময়ের। অন্য কোনো কিছুতে ব্যবধান নেই। ধাতুগতভাবে দুটি পদার্থ এক হলেও তা বৈশিষ্ট্য কিংবা গুণগত কারণে আলাদা শ্রেণীভুক্ত হয়ে যায়। লৌহ নির্মিত পৃথিবীর তাবৎ উপকরণই এক ও অভিন্ন। কিন্তু প্রক্রিয়াগত, গুণগত কিংবা বৈশিষ্টগত কারণে তা হাজারো শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যায়। বস্তুত বৈশিষ্টগত কারণেই বস্তুনিচয়ের মাঝে শ্রেণীবৈষম্য সৃষ্টি হয়। নতুবা পৃথিবীর অধিকাংশ জিনিসই ধাতুগতভাবে একজাতীয় উপাদানে প্রস্তুতকৃত। লোহা, পানি, মাটি, বৃক্ষ, প্রাণী ইত্যাদী কয়েকটি মৌলিক জিনিসকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীটা চলমান। এ গুটি কয়েকটি বস্তু থেকেই পৃথিবীর লক্ষ কোটি শ্রেণীর উপাদান তৈরি হয়েছে। এজন্য বস্তুগতভাবে লৌহনির্মিত সব জিনিসকে এক বলে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া একটি জিনিসের কয়েকটি নাম হতে পারে। তবে শর্ত হলো, যে কোনো সময় এবং যে কোনো স্থানে যে কোনো নামে ডাকার সুযোগ অবারিত থাকতে হবে। স্থান কাল পাত্র ভেদে নাম পরিবর্তন হলে বুঝতে হবে জিনিসটা মূলত এক ও অভিন্ন নয়। সুতরাং শুরু রাত্রে পড়লে যে নামাযকে তারাবীহ বলা যায় তাহাজ্জুদ বলা যায় না কেবল শেষ রাত্রে পড়লেই তাকে তাহাজ্জুদ বলা যায় এ দুই নামের নামাযকে আর যাইহোক এক নামায বলা যায় না।

কাশ্মীরী রাহ. আরো বলেন,
‘তবে তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে ভিন্ন শ্রেণীর ব্যবধান তখনই প্রমাণিত হবে যখন প্রমাণিত হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামাযের সাথে সাথে তাহাজ্জুদও পড়েছেন। মুহাম্মদ বিন নাসর রাহ. কিয়ামুল্লাইল সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যায় রচনা করেছেন। এবং তিনি লিখেছেন, কোনো কোনো সালাফের অভিমত হলো, যে ব্যক্তি তারাবীহ নামায পড়বে তার জন্য তাহাজ্জুদ পড়া নিষেধ। আবার কেউ কেউ বলেন, তার জন্য সাধারণ নফল নামায পড়ার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের মতভিন্নতাটা তেমন জটিল পর্যায়ের নয়। কারণ তাদের মতে এ দুটি নামায একই নামায। উমর রা. এর কর্মপন্থা এ বক্তব্যের সমর্থন করে। কারণ তিনি নিজ গৃহে শেষ রাতে তারাবীহ পড়তেন। অথচ তিনি নিজেই স্বউদ্যোগে তারাবীহ নামায জামাতসহ মসজিদে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও তিনি তাতে অংশ গ্রহণ করেননি। তার কারণ হলো, তিনি জানতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্মপন্থা হলো, শেষ রাতে তারাবীহ পড়া। এরপর তিনি এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামকে সতর্ক করলেন, তোমরা শুরু রাতে যে নামায পড়ো তার তুলনায় শেষ রাতের নামায শ্রেষ্ঠতর। তো তিনি দুটি নামাযকে এক করে দিয়েছেন। এবং শেষ রাতের নামাযকে শুরু রাতের নামাযের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করেছেন। উলামায়ে কেরাম যখন উমর রা. এর বক্তব্যের মর্মার্থ বুঝতে পারলেন না তখন তারা তাঁর বক্তব্যকে দুটি আলাদা নামাযের স্বপক্ষে প্রমাণ বানিয়ে ফেললেন। এবং বিশ্বাস করে নিলেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ আলাদা দুটি নামায।Ñআনওয়ার শাহ আলকাশমিরী, ফাইযুল বারী ৪/২৩, ২৪

প্রথম কথা হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম যে তারাবীহ এর সাথে তাহাজ্জুদ পড়েননি তারও কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ এর মাঝে পার্থক্যের প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো, যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়নি তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর তাহাজ্জুদ নামায ফরজ ছিল। এরপর মি’রাজ রজনীতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হলে তাহাজ্জুদ নামাযের আবশ্যকতা রহিত হয়ে যায়। সূরা মুযযাম্মিল আয়াত ৩, তাফসীরে ইবনে কাসীর ৫৭৪, মা‘আরিফুল কুরআন ৭৮৭ আর তাহাজ্জুদ নামায রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে আদায় করতেন। কারণ তাহাজ্জদু হলো নফল। আর নফল নামায রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে আদায় করতেন। তো তাহাজ্জুদের ব্যাপারটি ছিল পুরোনো বিষয়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো কোনো রমাযানে মসজিদে গিয়ে তাহাজ্জুদ পড়েননি এবং পড়লেও সে ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অজান্তে তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাননি। সাধারণ তাহাজ্জুদ নামায হলে এমনটি করার কথা ছিল না। এতেই প্রমাণিত হয়, তারাবীহ নামায সাধারণ তাহাজ্জুদ নামায ছিল না। রোযার বিধান অবতীর্ণ হয় দ্বিতীয় হিজরীতে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তারাবীহ সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি ছিল শেষ জীবনের। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় পদার্পন করলেন তখন দেখলেন ইয়াহুদীরা আশুরার দিন রোযা রাখছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি? তারা উত্তরে বলল, এটি একটি পূণ্যময় দিন। এ দিন আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাইলকে তাদের শত্রুদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। ফলে মুসা আ. রোযা রেখেছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি মুসা আ. এর ব্যাপারে তোমাদের তুলনায় বেশি অধিকার রাখি। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। এ ঘটনার পর আল্লাহ তা‘আলা এক মাসের রোযার বিধান প্রবর্তন করে আয়াত অবতীর্ণ করলেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ২০০৪, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/২৫৫
সার কথা, তাহাজ্জুদ এটি ইসলামের প্রথম যুগের বিধান। রমাযানের রোযা ফরজ হওয়ার অনেক আগে ইসলামের প্রথম যুগে মক্কায় তাহাজ্জুদ বিষয়ে সূরা মুয্যাম্মিল অবতীর্ণ হয়। আর রমাযানের রোযা ফরজ হয় হিজরতের পর মদীনায় দ্বিতীয় হিজরীতে। আর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘লা রমাযানের রোযা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন এবং এই মাসে রাত জেগে নামায পড়াকে সুন্নত করেছি। সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২২০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩২৮

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত হাদীসে রমাযানের রাতে যে নামাযকে সুন্নত করেছে তা দ্বারা যদি তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য হয় তাহলে তো হাদীসটি অনর্থক সাব্যস্ত হয়ে যায়। কারণ তাহাজ্জুদ নামাযের বিধান তো আগে থেকেই পুরো বছরের জন্য প্রবর্তিত হয়ে আছে। তো এখন নতুন করে তাহাজ্জুদকে সুন্নত হিসেবে প্রবর্তন করার কি মানে হতে পারে? তাছাড়া রোযার বিধান প্রবর্তিত হওয়ার আগে তো বহু রমাযান অতীত হয়েছে সেসব রমাযানে কি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম তাহাজ্জুদ আদায় করেননি? আদায় করে থাকলে এখন নতুন করে তাহাজ্জুদের বিধান প্রণয়নের কি স্বার্থকতা থাকতে পারে। তাছাড়া তাহাজ্জুদের বিধানটি সরাসরি কুরআনে পাকে অবতীর্ণ করেছেন। তাহলে এব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপরোক্ত বাণীটি কি করে প্রযোজ্য হতে পারে? যদি বলা হয় রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত তাহাজ্জুদের বিধানটিরই সীমাহীন গুরুত্ব বুঝানোর জন্য উক্ত উক্তি করেছেন। তাহলে বলব, আল্লাহ প্রদত্ত তাহাজ্জুদের বিধানটি তো সারা বছরের জন্য ব্যপৃত ছিল। এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীতে তো রমাযানের মাঝে সীমিত করে দেয়া হয়েছে। দুটি বিষয়ের সীমানা পরিধি তো এক হওয়া চাই। তা না হলে গুরুত্ব বর্ণনার কোনো সুযোগ থাকে না। বরং তা আলাদা দুটি বিষয়ে পরিণত হয়ে যায়। বরং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীটি এমন নামাযের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যার বিধান কুরআন মাজীদের মাধ্যমে নয়, হাদীসের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়েছে। আর তা হলো তারাবীহ নামায। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো, গাইরে মুকাল্লিদ ভাইয়েরা আট রাকাত তারাবীহ এর সপক্ষে ইমাম বুখারী রাহ. এর তাহাজ্জুদ বিষয়ক নির্দিষ্ট হাদীসটি দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন। এবং ইমাম বুখারী রাহ. এর অনুসরণের খুব আগ্রহ ও উদ্দীপনা প্রকাশ থাকেন। কিন্তু ইমাম বুখারী রাহ. কি আট রাকাত তারাবীহ এর সপক্ষে ছিলেন কি না? বা তারাবীহ নামায আদায়ের ব্যাপারে তাঁর কর্মপন্থা কি ছিল? ইতিহাস বলে, ইমাম বুখারী রাহ. তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদকে এক নামায মনে করতেন না; বরং দুটি নামাযকে ভিন্ন ভিন্ন নামায মনে করতেন। এবং তিনি রাতের প্রথম ভাগে তারাবীহ পড়তেন এবং শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ পড়তেন। আর তারাবীহের প্রতি রাকাতে বিশ আয়াত করে পাঠ করতেন। এবং এভাবেই কুরআন খতম করতেন। ঘটনাটি ইবনে হাজার আস্কালানী ফাতহুল বারীর ভূমিকা গ্রন্থ হাদইউস সারীতে, ইউসুফ আলমিযযী তাহযীবুল কামাল গ্রন্থে এবং খতীবে বাগদাদী তাঁর রিজাল গ্রন্থ তারিখে বাগদাদে আরো অন্যান্য রিজালবিদ ইমামগণ নির্ভরযোগ্য সূত্রে এনেছেন। বিষয়টি আরবী পাঠ নিম্নরূপ :
قال الحاكم أبو عبد الله الحافظ أخبرني محمد بن خالد حدثنا مقسم بن سعد قال كان محمد بن إسماعيل البخاري إذا كان أول ليلة من شهر رمضان يجتمع إليه أصحابه فيصلى بهم ويقرأ في كل ركعة عشرين آية وكذلك إلى أن يختم القرآن وكان يقرأ في السحر ما بين النصف إلى الثلث من القرآن فيختم عند السحر في كل ثلاث ليال- هدى السارى مقدمة فتح البارى ৫৬৩

অর্থ : মাকসাম বিন সা’দ রাহ. বলেন, রমাযান মাসে রাতের প্রথম ভাগে মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারীর নিকট তাঁর শিষ্যবৃন্দ জড়ো হয়ে যেত। তখন তিনি তাদের নিয়ে নামায পড়তেন। এবং প্রত্যেক রাকাআতে বিশ আয়াত করে পাঠ করতেন। এবং এভাবে তিনি কুরআন খতম করতেন। আর সাহরীর সময় নামাযে কুরআনের অর্ধাংশ থেকে নিয়ে এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পাঠ করতেন। এভাবে তিন রাতে সাহরীর সময় কুরআন খতম করতেন।-হাদইউস সারী ৫৬৩, ইউসুফ আলমিযযী, তারীখে বাগদাদ ২/১২, তাহযীবুল কামাল ২৪/৪৪৬, ইবনে আসাকী, তারিখু মাদীনাতি দিমাশক ৫২/৭৯, আবুল ফারজ ইবনুল জাওযী, সিফাতুস সাফওয়াহ ৩/১৯, ইয়া’লা হাম্বালী, তাবাকাতুল হানাবিলাহ ১/১৯৬

এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় ইমাম বুখারী রাহ. অন্যান্য উলামায়ে সালাফের মত তারাবীহকে তাহাজ্জুদ থেকে ভিন্ন নামায মনে করতেন। সাথে সাথে এটাও প্রমাণ হয়, ইমাম বুখারী রাহ. তারাবীহ আট রাকাআত নয় বেশি পড়তেন। কারণ তারাবীহ আট রাকাআত পড়লে রমাযান মাস ত্রিশ দিনের হলেও প্রতি রাকাআতে বিশ আয়াত করে পড়ে কুরআন খতম করা সম্ভব নয়।-মাওলানা আব্দুল মালেক দা. বা., তারাবীহ বিষয়ক দুটি প্রশ্ন ও তার উত্তর, মাজাল্লাতুল কাউসার সেপ্টেম্বর ’০৮, ১৮

তাহাজ্জুদ ইসলামের শুরু যুগে সবার উপর ফরজ ছিল। এক বছর পর তাহাজ্জুদের ফরজ বিধান রহিত হয়ে রমাযান এবং অন্যান্য মাসে নফল হিসেবে চলমান থাকে। সা’দ বিন হিশাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাতের নামায সম্বন্ধে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি পাঠ করোনি { يا أيها المزمل } ? তিনি বললেন, হ্যা, পাঠ করেছি। আয়িশা রা. বললেন যখন এ সূরাটির প্রথম অংশ অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবায়ে কেরাম রাতে নামায পড়তে শুরু করেন। ফলে তাঁদের পদদ্বয় ফুলে যায়। সূরার শেষ অংশ এগারো মাস আকাশে আবদ্ধ থাকে। এক বছর পর তা অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাতের নামায ফরজ হওয়ার পর নফলে পরিণত হয়ে যায়।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩৪২
আয়িশা রা. এর হাদীস দৃষ্টে ইমাম বাগাভী রাহ. বলেন, এই আয়াতের আলোকে তাহাজ্জুদ অর্থাৎ রাত্রির নামায রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সমগ্র উম্মতের উপর ফরজ ছিল। এটা পাঞ্জেগানা নামায ফরজ হওয়ার পূর্বের কথা। এই আয়াতে তাহাজ্জুদের নামায কেবল ফরজই করা হয়নি; বরং তাতে রাত্রির কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ নিযুক্ত থাকাও ফরজ করা হয়েছে। কারণ আয়াতের মূল আদেশ হচ্ছে, কিছু অংশ বাদে সমস্ত রাত্রি নামাযে রত থাকা। উক্ত আয়াতের আদেশ পালনার্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ রাত্রি তাহাজ্জুদের নামাযে ব্যয় করতেন। ফলে তাঁদের পদদ্বয় ফলে যায় এবং আদেশটি বেশ কষ্টসাধ্য প্রতীয়মান হয়। পূর্ণ এক বছর পর সূরার শেষাংশ فاقرءوا ماتيسر منه অবতীর্ণ হলে দীর্ঘক্ষণ নামাযে দ-ায়মান থাকার বাধ্যবাধকতা রহিত করে দেয়া হয় এবং বিষয়টি ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়ে ব্যক্ত করা হয় যে, যতক্ষণ নামায পড়া সহজ মনে হয়, ততক্ষণ নামায পড়াই তাহাজ্জুদের জন্য যথেষ্ট। এই বিষয়বস্তু সুনানে আবুদাউদ ও নাসয়ীতে আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মিরাজ রাত্রিতে পাঞ্জেগানা নামায ফরজ হওয়ার আদেশ অবতীর্ণ হলে তাহাজ্জুদের আদেশ রহিত হয়ে যায়। তবে এরপরও তাহাজ্জুদ সুন্নত থেকে যায়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন।-মা‘আরিফুল কুরআন (বাংলা) ১৪১৪

হাদীসটির পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। প্রশ্নটি হলো, তাহাজ্জুদ প্রথমে ফরজ ছিল। এরপর তা নফল করা হয়। অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামায ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে জামাতবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক পড়েননি। এখন যদি বলা হয়, তাহাজ্জুদ এবং তারাবীহ একই নামায তাহলে প্রশ্ন হয়, একই নামাযকে একবার ফরজ করলেন এরপর আবার তার ফরজ বিধান রহিত করে নফল করে দিলেন সেই নামাযের নফল বিধান রহিত করে দিয়ে আবার ফরজ করে দিবেন বা দিতেন? ইসলামী শরীয়ার কোনো বিধানের ক্ষেত্রে কি এমনটি হয়েছে যে, একবার ফরজ করে আবার নফল করা হয়েছে। এরপর আবার ফরজ করা হয়েছে বা ফরজ করার আশংকা বা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন তাহাজ্জুদ শেষ রাতে পড়তেন। মাসরুক রা. বলেন, আমি আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে কখন নামায আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, যখন গভীর রজনীতে মোরগের ডাক শুনতেন তখন নামায আদায় করতেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৩২
অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীহ নামায শুরু রাত্রে পড়তেন। আবুযর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে রোযা রাখতাম। তিনি আমাদের নিয়ে রমাযান মাসে রাতের নামায পড়েননি। তবে রমাযানের সাত দিন অবশিষ্ট থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামায পড়লেন। রমাযানের ছয় দিন বাকি থাকতে আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন না। আবার রমাযানের পাঁচ দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্ধ রাত্র পর্যন্ত আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমাদের সারা রাত নামায পড়ার সুযোগ দিতেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি ইমামের নামায শেষ পর্যন্ত তার সাথে নামায পড়ে তাহলে তখন তার আমল নামায় সারা রাত নামায পড়ার পূণ্য লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর রমাযানের চার দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন না। তবে রমাযানের তিন দিন বাকি থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরিবার, স্ত্রী এবং অন্যান্য লোকদের একত্রিত করলেন এবং আমাদের নিয়ে সফলতা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত নামায পড়লেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সফলতা কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাহরীর সময়। এরপর রমাযানের অন্যান্য দিনগুলোতে আমাদের নিয়ে রাতের নামায পড়েননি।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১০৯২

সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিয়ীগণও শুরু রাত্র থেকে তারাবীহ পড়া আরম্ভ করতেন :
হাসান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষ রমাযান মাসে নামায পড়ত। যখন রাতের এক চতুর্থাংশ গত হয়ে যেত তখন ঈশার নামায পড়ত। এবং যখন নামায থেকে ফিরে আসত তখন রাতের এক চতুর্থাংশ অবশিষ্ট থেকে যেত।-মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস ৭৭৪০
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় তাহাজ্জুদ একাকী পড়তেন। কখনো লোকজন ডেকে জামাত করতেন না। তবে যদি কেউ এসে দাঁড়িয়ে যেত তবে তিনি কিছু বলতেন না। যেমন ইবনে আব্বাস রা. নিজে একবার তাহাজ্জুদের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে তারাবীহ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এর জন্য কয়েকবার ডেকে ডেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাত করেছেন। অন্য দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের জন্য পুরো রাত কখনো জাগ্রত থাকেননি। আয়িশা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোর পর্যন্ত পূর্ণ রাত নামায পড়েননি এবং কোনো রাত্রে পূর্ণ কুরআন শরীফ পড়েননি।-সুনানে আবুদাউদ, হাদীস ১৩৪২
আয়িশা রা. এর এ বক্তব্য ছিল তাহাজ্জুদ বিষয়ে। নতুবা উপরে আবুযর রা. এর বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবহে সাদিক পর্যন্ত তারাবীহ নামায পড়েছেন। আর আবু যর রা. এর বর্ণনা সম্পর্কে আয়িশা রা. এর সম্যক ধারনা ছিল। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীদেরকে একত্রিত করে তারাবীহ নামায পড়েছেন। সুতরাং এ বিষয়টি আয়িশা রা. এর অগোচরে থাকার কোনো প্রশ্নই উঠে না। …..ফাতাওয়া রাশীদিয়া ৩৫২….

এরপর কথা হলো, সালাফী ভাইয়েরা আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ. এর উদ্ধিৃতি দিয়ে কি বুঝাতে চান? তারা কি বুঝাতে চান যে, কাশ্মিীরী রাহ. যেহেতু জোর দিয়ে বলেছেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ এক নামায সুতরাং তার নিকটও তারাবীহ এর রাকাত সংখ্যা বিশ রাকাত নয়; আট রাকাত? তবে শুনুন তাঁর তারাবীহ সংক্রান্ত আরেকটি বক্তব্য। কশ্মীরী রাহ. বলেন, ‘উমর রা. থেকে তারাবীহ নামাযের বিভিন্ন সংখ্যা বর্ণিত হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তমূলক চূড়ান্ত বক্তব্য হলো, তারাবীহ নামাযের রাকাত সংখ্যা হলো বিশ রাকাত; সাথে বিতরের তিন রাকাত। মুয়াত্তা মালিকের বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমর রা. কিরাতকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়ে রাকাত সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন। উম্মাহর সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়ে যাওয়ার পর এখন আমাদের জন্য আলোচনার সুযোগ নেই যে, এটা কি উমর রা. এর ইজতিহাদপ্রসূত কর্মপদ্ধতি ছিল? না কি ছিল? যে ব্যক্তি হাদীস অনুযায়ী আমল করতে চায় তার জন্য উত্তম হলো, সাফল্য বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সাহরীর সময় শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তারাবীহ নামায পড়বে। কারণ এটা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রমাযানের শেষ দিনের নামায। আর যে ব্যক্তি আট রাকাত তারাবীহকে যথেষ্ট মনে করে এবং বৃহত্তম জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এবং তাদেরকে বিদাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করে তারা অবশ্যই তাদের পরিণতি দেখতে পাবে।-আনওয়ার শাহ আলকাশমিরী, ফাইযুল বারী ৪/৩৪১

এখানে উল্লেখ করার মত বিষয় হলো, আমাদের সালাফী ভাইরা তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ নামাযকে এক বলছেন এবং তা লোক সমাজে প্রচার করে চলছেন। অথচ তাদের দায়িত্বশীল আলেমগণ মনে করেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ ভিন্ন দু শ্রেণীর নামায। এক্ষেত্রে প্রশিদ্ধ গাইরে মুকাল্লিদ আলেম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর একটি আলোচনা প্রনিধানযোগ্য। মাওলানা আব্দুল্লাহ চকরালভী যখন তারাবীহ তাহাজ্জুদ নামায এক হওয়ার কথা প্রচার করতে আরম্ভ করে তখন মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী লিখেন‘… এই সুস্পষ্ট জবাব পেয়েও ওই মৌলভী সাহেব (চকরালভী) তা মানতে রাজি হননি; বরং জবাবের ‘জবাব’ তৈরির অনেক চেষ্টা করেছেন। তার সকল চেষ্টার সারকথা এই যে, প্রথম রাতের নামায এবং শেষ রাতের নামায বস্তুত একই নামায, দুই নামায নয়। তারাবীহ যা প্রথম রাতে পড়া হয় তার অপর নাম তাহাজ্জুদ। এ কথার জবাবে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এ দাবির সপক্ষে কোনো দলীল নেই। বরং বিপক্ষে দলীল রয়েছে। কেননা তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থই হলো, ঘুম থেকে জেগে নামায আদায় করা। কামূসে রয়েছে, تهجد-استيقظ  অর্থ : সে ঘুম থেকে জাগ্রত হলো। ‘রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানে এবং রমাযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, প্রথম রাত এবং শেষ রাতের নামায একই নামায; বরং এ হাদীস থেকে শুধু এটুকুই প্রমাণ হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাআত নামায পড়তেন।’- সানাউল্লাহ অমৃতসরী, আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯২-৯৩

অন্য দিকে রমাযান মাসে ঈশার সাথে তারাবীহ নামায পড়ার পর তাহাজ্জুদ পড়া যাবে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে :
প্রশ্ন : যে ব্যক্তি রমাযান মাসে ঈশার সময় তারাবীহ নামায পড়ল সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে পারবে কি না ?
উত্তর : পারবে। কেননা তাহাজ্জুদের সময়ই হচ্ছে সুবহে সাদিকের আগে। প্রথম রাতে তাহাজ্জুদ হয় না।
প্রশ্ন : রমাযান মাসে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দুই নামায থাকে, না তারাবীহ নামাযই তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়ে যায়?
উত্তর : যদি তারাবীহ প্রথম রাতে আদায় করা হয় তবে তা শুধু তারাবীহ বলে গণ্য হয়। আর শেষ রাতে পড়লে তা তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়।Ñসানাউল্লাহ অমৃতসরী, ফাতাওয়া সানাইয়্যাহ : ১/৬৮২-৬৫৪
উপরোক্ত প্রশ্নোত্তর থেকে যে বিষয়গুলো উপলব্ধ হয় :
১. যে ব্যক্তি প্রথম রাতে তারাবীহ পড়ে সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদও পড়তে পারে। যেহেতু আজকাল সকল মানুষ প্রথম রাতেই তারাবীহ পড়ে থাকে তাই তাদের শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়া উচিত।
২. তাহাজ্জুদের সময় হলো রাতের শেষ ভাগে।
৩. প্রথম রাতের ইবাদতকে তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী বলা যায় না।
৪. কেউ যদি কখনো শেষ রাতে তারাবীহ পড়ে তবে তা তাহজ্জুদেরও স্থলবর্তী হবে। এ কথার আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মাওলানা সানউল্লাহ অমৃতসরীর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তারাবীহ তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হওয়ার কারণে এই দুইটি এক নামায হওয়া প্রমাণিত হয় না। যেমন জুমআর নামায জোহরের স্থলবর্তী হওয়ায় জুমআ- জোহর এক নামায প্রমাণিত হয় না।’ আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯৩
মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ অনুদিত ড. শায়খ মুহাম্মদ ইলয়াস ফয়সাল রচিত নবীজীর নামায ৩৭০-৩৭৩

তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেয়া হয়, বিশ রাকাআত তারাবীহ উমর রা. কর্তৃক প্রবর্তিত ছিল এবং এটা তার ইজতিহাদপ্রসূত বিষয় ছিল বুও এটাকে পরিত্যাক্ত বিদাত বলে ফেলে দেবার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, ইমাম আউযায়ী রাহ. বলেন, যখন নতুন কোনো বিষয়ের আবির্ভাব হয় এবং সেটাকে বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরাম প্রত্যাখান না করে তাহলে সেটা সুন্নত হিসেবে পরিগণিত হয়ে যায়। যেমন উমর রা. তারাবীহ নামাযের ক্ষেত্রে লোকজনকে একত্রিত করলেন যাতে উবাই বিন কা’ব রা. তাদের নিয়ে জামাতবদ্ধভাবে নামায আদায় করেন। যখন উমর রা. পরদিন দেখলেন, লোকজন জামাতবদ্ধভাবে তারাবীহ নামায আদায় করছে তখন বললেন বাহ কত সুন্দর নতুন ব্যাপার! উমর রা. কর্তৃক জামাতবদ্ধ এ রূপকে বিদাত (নতুন বিষয়) বলায় কোনো আপত্তি নেই। নতুবা এটা তো সুন্নত। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার তিরোধানের পর তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তারা নানা ধরনের মতভিন্নতা দেখতে পাবে। সেক্ষেত্রে তোমরা আমার এবং আমার সত্যনিষ্ঠ সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সুন্নাহ ও আদর্শকে গ্রহণ করবে। একে তোমরা আকড়ে ধরবে এবং দন্তমড়ির সাহায্যে কামড়ে ধরার ন্যায় প্রাণপণে আকড়ে ধরবে। এবং তোমরা (ধর্মীয় বিষয়ে) নবাবিস্কৃত বিষয়াদি থেকে খুব সতর্কতার সাথে নিবৃত্ত থাকবে। কারণ প্রতিটি নব আবিস্কৃত বিষয়ই হলো বিদাত। আর প্রতিটি বিদাত হলো পথভ্রষ্টতা। (সুনানে আবুদাউদ ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযী ২৬৭৬, মুসনাদে আহমদ ১৬৬৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ ৪২, সহীহ ইবনে হিব্বান ৫) সুতরাং তারাবীহকে একত্রিত করা সুন্নত যা উপরোল্লিখিত হাদীসের ভাষ্যে প্রমাণিত।- হাফেজ আবুল ওয়ালীদ আলবাজী, আত তা’দীল ওয়াত তাজরীহ ১/৪৪

আল্লামা কাশ্মিরী রাহ. বলেন, ইমাম চতুষ্টয়ের কেউ তারাবীহের রাকাত সংখ্যা বিশের কম বলেননি। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবায়ে কেরামের অভিমত এটিই।-আলআরফুস সাযী শরহু সুনানিত তিরমিযী ২/২৯৩

আবুল মু’তার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান রা. কে জিজ্ঞেস করলাম রামাযান মাসে আমি লোকদেরকে নিয়ে কখন নামাযে দাঁড়াবো? তিনি বললেন, মুসল্লীদের উপযোগী এবং সুবিধাজনক সময়কে প্রাধান্য দাও।Ñ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ ১৫/৪৩৩/ ২২৯
হাকাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকজন রমাযান মাসে নামাযে দাঁড়ানোর আগে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিত।- মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ ১৫/৪৩৩/ ২২৯

আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে চার রাকাত নামায পড়তেন এরপর তারাওউহ করতেন। অর্থাৎ বিশ্রাম গ্রহণ করতেন। এরপর আবার দীর্ঘক্ষণ নামায আদায় করতেন। ফলে আমার তাঁর উপর খুব মায়া হতো। আমি বলতাম, আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর আমার বাবা মা উৎসর্গিত হোক আল্লাহ তা‘আলা তো আপনার অতীতের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞ বান্দাহ হবো না! ইমাম বাইহাকী রাহ. বলেন, যদি ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়ে থাকে তাহলে সেটা হলো ইমাম সাহেব তারাবীহ নামাযে যে চার রাকাত পর বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকেন সে বিশ্রাম।Ñ সুনানে বাইহাকী, হাদীস ৪৮০৭

প্রশ্ন : তারাবীহ নামাযের ব্যাপারে মহামান্য ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য কি? তারাবীহ নামায বিশ রাকাত সুন্নাত না আট রাকাত সুন্নত? যদি আট রাকাত সুন্নত হয় তাহলে মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত পড়া হয় কেন? যেমন আমরা শুনেছি, মসজিদে নববীতে বিশ রাকত তারাবীহ পড়া হয়। সমস্ত মানুষ এটাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে বলছে যে, তারাবীহ নামায বিশ রাকাত পড়া সুন্নত।
উত্তর : তারাবীহ নামায সুন্নত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নামাযকে সুন্নত হিসেবে প্রবর্তন করে গেছেন। বিভিন্ন সূত্র প্রমাণ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান এবং অন্যান্য মাসে এগারো রাকাতের চেয়ে বেশি পড়তেন না। আবু সালামা রা. আয়িশা রা. কে জিজ্ঞেস করলেন, রমাযান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায কিরূপ ছিল? তখন তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান এবং অন্যান্য মাসে এগারো রাকাআতের চেয়ে বেশি পড়তেন না। চার রাকাআত নামায আদায় করতেন। তুমি এর সৌন্দর্য এবং দীর্ঘতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না। এরপর আবার চার রাকাত নামায আদায় করতেন। তুমি এর সৌন্দর্য এবং দীর্ঘতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করো না। এরপর তিন রাকাআত পড়তেন। আয়িশা রা. বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতর নামায পড়ার আগে ঘুমান? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়শা! আমার নেত্রদ্বয় ঘুমায় কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না। মুত্তাফাক আলাইহ। এবং এ বিষয়টিও প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কোনো রাতে তের রাকাত পড়তেন। বিপরীত বক্তব্য সম্বলিত দুটি হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য আয়িশা রা. উদ্ধৃত হাদীসটিকে অধিকাংশ সময়ের সাথে সম্পৃক্ত বলে গণ্য করা অপরিহার্য। সুতরাং এগারো রাকাতের চেয়ে অতিরিক্ত নামায আদায় করতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের নামাযে সংখ্যা নির্ধারণ করতেন না। বরং যখন তাঁকে রাতের নামাযের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি বলতেন, দু রাকাআত দু রাকাআত করে। যখন তোমাদের কেউ সুবহে সাদিক উদিত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করবে তখন সে যেন পঠিত নামাযের সাথে অতিরিক্ত এক রাকাআত মিলিয়ে বিতর পড়ে নেয়। মুত্তাফাক আলাইহ। তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাত এবং এতদভিন্ন অন্য কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করেননি। সুতরাং এ বিষয়টি রমাযান এবং অন্যান্য মাসে রাতের নামাযের ব্যাপারে ব্যাপকতার প্রমাণ বহন করে। -ড. খালিদ বিন আব্দুর রাহমান জুরাইসী, ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৯৩৩